রাহুলের আজকাল কেন যেন মনে হচ্ছে ওর স্ত্রী কোনো অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। বাবানের ব্যাপারটা কেবলই অজুহাত মাত্র, পরকীয়া লুকোবার বাহানা। নাহলে প্রতি রাতে সে ঘুমিয়ে পড়ার পরে মৌমা এভাবে চুপিচুপি বেরিয়ে যায় কেন? ঘটনাটা শুরু হয়েছে একমাস আগেই। বাবান চলে যাওয়ার ঠিক পনেরো দিন পর থেকে। প্রথম প্রথম সে টের পেত না, কিন্তু ওর অফিসের এক কলিগ ওকে ডেকে সেদিন বলল, “কাল রাতে তোমার স্ত্রীকে নাইট ড্রেস পরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখলাম। আমি ওনাকে থামাবারও চেষ্টা করলাম, কিন্তু উনি গ্রাহ্যই করলেন না।”
কথাটা শুনেই রাহুলের বুকের ভিতরটা শিরশির করে উঠেছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, মৌমার কি তবে কোনো মানসিক সমস্যা শুরু হয়েছে? বাবানের মৃত্যুটা ওদের কাছে একটা বিশাল ধাক্কা। ওদের দেড় বছরের ছেলে বাবান। আধো আধো সুরে কথা বলা শিখেছিল। অল্প সলিড ফুড খাওয়া শুরু করলেও মায়ের দুধ ছাড়া সে থাকতেই পারত না। দুই মাস আগে, ছোট্ট বাবানের সাথে যে এমন মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যাবে, তা কল্পনাও করতে পারেনি ওরা। জানলা দিয়ে কখন যে একটা কালান্তক সাপ ঘরে ঢুকে পড়েছিল কে জানে! ওদের অলক্ষ্যে বিষধর সাপটা ছোবল মেরেছিল বাবানকে। বাচ্চার কান্না শুনে ছুটে গিয়ে ওরা দেখে, বাবানের পা দিয়ে রক্ত ঝরছে আর সাপটা জানলা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তড়িঘড়ি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও শেষরক্ষা হয়নি। বিষের তীব্রতায় নীল হয়ে গিয়েছিল ছোট্ট শরীরটা। বাবানকে হারিয়ে মানসিকভাবে ওরা দু’জনেই খুব ভেঙে পড়েছিল।
কিন্তু সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওরা তো ধীরে ধীরে আবার উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে, তা সত্ত্বেও মৌমা কেন এমন করছে? সেদিনই অফিস থেকে বাড়ি ফিরে মৌমাকে প্রশ্নটা করেছিল রাহুল, “কাল রাতে তুমি কোথায় গিয়েছিলে?” ভাবলেশহীনভাবে মৌমা উত্তর দিয়েছিল, “বাবানের কাছে।” রাহুলের বুকের ভিতরটা ধক করে উঠেছিল। কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করেছিল, “মানে? তুমি কবরখানায় গিয়েছিলে?” মৌমা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল। তারপর বলেছিল, “বড্ড কাঁদছিল আমার ছোট্ট ছেলেটা। ওর ভীষণ খিদে পেয়েছিল।” রাহুল বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলেছিল, “তুমি কেন বুঝতে চাইছ না মৌ, আমাদের বাবান আর এই পৃথিবীতে নেই। ও আর কোনো দিনও কাঁদবে না।” মৌমা উত্তর দিয়েছিল, “তুমি বুঝতে চাইছ না। বাবান এখনো আছে। আমাদের খুব কাছেই আছে। প্রতি রাতেই খিদের জ্বালায় কাঁদে আর আমাকে ‘মা’ ‘মা’ করে ডাকে। ওর ডাককে আমি অবহেলা করব কী করে?”
তার পরের দিনই মৌমাকে নিয়ে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গিয়েছিল রাহুল। ডক্টর কিছু ওষুধ প্রেসক্রাইব করে দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই ওষুধে যে মৌমার মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি, সেটা রাহুল স্পষ্ট বুঝতে পারছে। রাহুল বিভিন্নভাবে মৌমাকে বোঝানোরও চেষ্টা করেছে, কিন্তু কিছুতেই কোনো লাভ হয়নি।
আজকাল ডিনারের পরেই রাহুল অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ে। সম্ভবত ওর খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয় মৌমা। তারপর রাত হলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। প্রথম প্রথম বাবানের শোক ভেবে চুপ করে থাকলেও এবার রাহুলের কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে, মৌমা কোনো পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েনি তো? দুঃখের সময় মানুষ একটা অবলম্বন খোঁজে। হয়তো সেই অবলম্বন খুঁজতে গিয়েই…! দুঃখ তো রাহুলও কম পায়নি, তবু ওর তো অন্য কাউকে আঁকড়ে ধরার কথা মনে হয়নি কোনোদিন! বরং রাহুল তো মৌমাকে নিয়েই আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করার কথা ভেবেছিল।
বেশ কয়েকদিন এইভাবেই চলার পর, একদিন ডিনার টেবিলে বসে রাহুল কঠিন স্বরে মৌমাকে বলল, “আমার মনে হচ্ছে তোমার এই প্রতি রাতে বেরিয়ে যাওয়াটা কোনো স্বাভাবিক ব্যাপার নয়।” মৌমা অবাক সুরে প্রশ্ন করল, “কী মনে হয় তোমার?” রাহুল একই স্বরে বলল, “আমার সন্দেহ তুমি কোনো অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছ।” মৌমা এবার রেগে গেল। উচ্চস্বরে বলে উঠল, “জড়িয়ে পড়েছি তো বেশ করেছি। তার জন্য তুমি কি আমাকে ডিভোর্স দেবে? নাকি তোমার বাড়ি থেকে বার করে দেবে?” রাহুলেরও মাথা গরম হয়ে গেল। কিছু না ভেবেই বলল, “প্রয়োজন হলে তাই করতে হবে।” মৌমা বলল, “কিন্তু কাউকে ডিভোর্স দিতে গেলে প্রমাণের দরকার হয়। সন্দেহের বশে কাউকে ডিভোর্স দেওয়া যায় না, সেটা জানো তো? তুমি আগে প্রমাণ জোগাড় করো, তারপর আমাকে ডিভোর্সের কথা বলবে।”
মাথা গরম করে বারান্দায় চলে গেল রাহুল। একটা সিগারেট ধরাল। ওর মনে হলো মৌমা ওকে চ্যালেঞ্জ করছে। আসলে বাবান একটা বাহানা মাত্র। রাত হলেই মৌমা ওর নতুন বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে দেখা করতে যায়। ওকে খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিয়ে যায়, যাতে সে ওকে ফলো করতে না পারে। কিন্তু ওর নামও রাহুল মুখার্জী। এই অনাচারের শেষ দেখে সে ছাড়বে। প্রয়োজনে একদিন ডিনার করবে না বা বাইরে থেকে খেয়ে আসবে, কিন্তু মৌমার অবৈধ সম্পর্কের সত্যটা তাকে প্রমাণ করতেই হবে।
সেদিন রাতে অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়ল রাহুল। মৌমা ওকে একগ্লাস দুধ খাওয়ানোর জন্য পীড়াপীড়ি করছিল, কিন্তু সে খেল না। বিছানায় শুয়ে চুপচাপ মড়ার মতো পড়ে রইল। এমন ভান করল যেন সত্যি সত্যিই সে ঘুমিয়ে পড়েছে। আজ রাতে মৌমার মুখোশ সে খুলবেই। ওকে আর ওর নতুন বয়ফ্রেন্ডকে হাতেনাতে ধরবে, প্রমাণ করে দেবে ওর সন্দেহ অমূলক নয়।
বিছানায় উত্তেজিতভাবে শুয়ে ছিল রাহুল। দেখতে দেখতে ছায়ার মতো রাত বাড়ছিল। ঘড়ির কাঁটায় এখন রাত দেড়টা বাজে। ওর পাশেই অঘোর ঘুমে তলিয়ে রয়েছে মৌমা। কোনো হেলদোল নেই। কী নিষ্পাপ লাগছে ওর মুখখানা। দেখে মনেই হচ্ছে না মৌমার কোথাও যাওয়ার তাড়া আছে। শুয়ে থাকতে থাকতে রাহুল ক্রমশই হতাশ হয়ে পড়ছিল, ওর মনে হচ্ছিল মৌমা হয়তো ওর প্ল্যানটা বুঝে গেছে, আজ রাতে হয়তো আর বেরোবেই না। কিন্তু হঠাৎই ঘড়িতে ঢং ঢং করে রাত দুটো বাজতেই দু’বার এপাশ ওপাশ করে বিছানার উপরে উঠে বসল মৌমা। ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। রাহুল প্রথমে চমকে গিয়েছিল। অঘোর ঘুমে তলিয়ে থেকেও মৌমা যে এভাবে উঠে বেরিয়ে যাবে সে কল্পনাই করেনি। একটু ধাতস্থ হতেই বিছানা ছেড়ে সেও মৌমার পেছনে পেছনে বেরিয়ে এল।
কেমন যেন টলতে টলতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে মৌমা। মনে হচ্ছে ও যেন স্বাভাবিক অবস্থায় নেই, ঘুমের ঘোরে হাঁটছে। হাত দশেক দূরত্ব রেখে ওকে ফলো করে হেঁটে চলল রাহুল। ওর গা ছমছম করতে লাগল। বড়ো রাস্তা ছেড়ে মৌমা এখন জঙ্গলের দিকে বাঁক নিয়েছে। চারপাশে ঘনিয়ে আছে এক আদিগন্ত অমানিশা। কৃষ্ণবর্ণ আকাশ থেকে ফ্যালফ্যালিয়ে উঁকি মারছে আধখানি চাঁদ। আশেপাশের বাতাস ভরে আছে এক অদ্ভুত শিহরণে। দুপাশের গাছগুলো যেন অদ্ভুত এক আতঙ্ক গায়ে মেখে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে অদ্ভুত শব্দে পাখা ঝাপটে উঠছে পাখ-পাখালির দল। হঠাৎ এক টুকরো আবছায়া অন্ধকার পেরোতেই মৌমাকে আর সে দেখতে পেল না। কোথায় গেল সে? এই তো ওর সামনে দিয়েই হাঁটছিল এতক্ষণ! হঠাৎ কীভাবে ভ্যানিশ হয়ে গেল! ওর বুকের ভিতরটা ভয়ে কেঁপে উঠল। বেশ কিছুক্ষণ থম মেরে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকার পরে, ক্রমশ রাস্তাটাকে চিনতে পারল সে।
খুব ছোটবেলায় যখন লুকোচুরি খেলত, এই রাস্তা দিয়েই সে যাতায়াত করত। রাস্তার শেষ মাথায় রয়েছে বাচ্চাদের কবরখানা। ওখানেই কালু, রশিদ, জন, নিয়ামত, রৌনকের সঙ্গে লুকোচুরি খেলত সে। তিন ধর্মেই বাচ্চাদের কবর দেওয়া হতো বলে কবরখানাটা একটা মহামিলন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। বেশ কাটছিল দিনগুলো, কিন্তু একদিন ওদের পাড়ার সুধীর কাকা ওকে কবরখানার দিকে যেতে দেখে ফেলেন। তারপর খুব বকাবকি করে বলেছিলেন, ওই কবরখানায় যেসব বাচ্চারা থাকে, তারা নাকি কেউই জীবন্ত নয়… আর তারপর থেকেই রাহুল কবরখানায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। মৌমা কি তবে ওই কবরখানাতেই যাচ্ছে? অবশ্য কারোর সঙ্গে মিট করার জন্য এর চেয়ে ভালো আর নির্ঝঞ্ঝাট জায়গা অন্য কী-ই বা আছে? কেউ তো সেখানে যাবে না।
এইসব চিন্তা করতে করতেই অনেকটা সময় কেটে গেছে। আর বেশিক্ষণ দাঁড়ালে হয়তো মৌমাকে ধরতে পারবে না রাহুল, তাই আপাতত ভাবনা বন্ধ করে ধীরে ধীরে সে কবরখানার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। কোমর সমান উঁচু ঝোপঝাড়। যেতে যেতে ওর বারবারই মনে হতে লাগল ছায়ার ভেতর থেকে কারা যেন কৌতূহলী মুখে ওর দিকে তাকিয়ে দেখছে। বেশ কিছুক্ষণের মধ্যেই সে কবরখানার ভেতরে পৌঁছে গেল। কবরখানার মাঝবরাবর আসতেই দেখতে পেল ওর দিকে পেছন ফিরে মাটির উপরে মৌমা বসে আছে, ওর কোলে কিছু একটা বস্তু। সেটাকে দুলিয়ে দুলিয়ে সে ঘুম পাড়াচ্ছে। বস্তুটা কী? আরো ভালো করে দেখবে বলে সে মৌমার দিকে এগিয়ে গেল। কাছাকাছি আসতেই ওর বুকের ভিতরটা শিহরণে কেঁপে উঠল। মৌমার কোলে শুয়ে আছে ওরই দুই মাস আগে মৃত সন্তান বাবান। দুই মাস ধরে মাটির তলায় থাকার দরুণ বাবানের সারা শরীরের মাংস খসে পড়েছে। অক্ষিকোটর থেকে বীভৎসভাবে বেরিয়ে পড়েছে দুটো চোখ। চাঁদের আলোয় মাড়িহীন দাঁতগুলো চকচক করছে। তবু মৌমার কোলে শুয়ে দুধ খেতে খেতে খিলখিল করে হাসছে সে। আর এক একবার মুখ তুলে বলছে, “মাম্মি দেখ, আজ বাপিও আমার কাছে এসেছে! কী মজা! দেখ মাম্মি দেখ…”


