অমাবস্যার রাত, তার ওপর মুষলধারে বৃষ্টি। বম্বে রোডের ওপর দিয়ে জয়ের বিএমডব্লিউ-টা যেন জল কেটে স্রেফ উড়ে চলেছে। ওয়াইপারগুলো সর্বোচ্চ গতিতে চালিয়েও সামনের কাঁচ পরিষ্কার রাখা দায়। হাইওয়ের দুপাশে ঘন জঙ্গল, মাঝে মাঝে বিদ্যুচ্চমকে সেই জঙ্গলটাকে মনে হচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক কোনো দানবের হাঁ করা মুখ।
হঠাৎ হেডলাইটের আলোয় বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল জয়ের। রাস্তার মাঝখানে ওটা কী? সাদা শাড়ি পরা একটা অবয়ব!
পায়ের সমস্ত জোর দিয়ে ব্রেক কষল জয়। চাকাগুলো ভিজে পিচের ওপর দিয়ে তীক্ষ্ণ আর্তনাদ করে ঘষতে ঘষতে এগিয়ে গেল। গাড়িটা যখন থামল, তখন বনেটটা ওই মূর্তিটার শরীর ছুঁইছুঁই।
গ্লাস নামিয়ে জয় চিৎকার করতে যাচ্ছিল, কিন্তু গলার স্বর ফুটল না। মেয়েটি জানলার কাছে এগিয়ে এসেছে। বৃষ্টির জলে তার সর্বাঙ্গ ভিজে চুপসে গেছে, চুলগুলো লেপটে আছে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া গালের দুপাশে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, এত বড় একটা দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার পরেও মেয়েটার চোখেমুখে কোনো ভয় নেই, আছে কেবল একরাশ ক্লান্তি আর আকুতি।
কাঁপা গলায় মেয়েটি বলল, “প্লিজ, আমাকে একটু হেল্প করবেন? ব্লাড ব্যাঙ্কে এসেছিলাম, কিন্তু ফেরার কোনো গাড়ি পাচ্ছি না। আমার হাসবেন্ড হসপিটালে… খুব ক্রিটিক্যাল। এই রক্তটা না পৌঁছলে ওকে আর বাঁচানো যাবে না।”
মেয়েটার হাতে একটা ইনসুলেটেড রক্তের ব্যাগ। জয়ের রাগটা মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। সে পেছনের দরজাটা আনলক করে দিয়ে বলল, “উঠে পড়ুন। আমি পৌঁছে দিচ্ছি।”
গাড়ির পেছনের সিটে উঠে মেয়েটি বলল, “বাইপাসের ধারের সিটি হসপিটাল। ওখানেই ভর্তি।”
গাড়ি আবার গতি নিল। গাড়ির ভেতরে এসি চলছে, বাইরের পরিবেশও ঠান্ডা, তবু জয়ের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। রিয়ার-ভিউ মিরর দিয়ে সে একবার তাকাল। মেয়েটি একদৃষ্টে জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে।
নিস্তব্ধতা ভাঙতে জয় বলল, “এত রাতে একা বেরিয়েছেন? বাড়িতে আর কেউ নেই?”
মেয়েটি জানলার দিক থেকে মুখ না ফিরিয়েই উত্তর দিল, “না। আমার কেউ নেই। বাবা মারা যাওয়ার পর ভাইয়েরা সব সম্পত্তি লিখে নিয়েছিল। আমার বিয়ে হয়েছিল এক বড়লোক বাড়িতে, কিন্তু সুখ কপালে সইল না। স্বামীর কিডনি ফেলিওর। মদের নেশাই কাল হলো। আজ তারও শেষ অবস্থা।”
জয়ের মনে হলো ঘটনাটা খুব চেনা। সে বলল, “ভাগ্য। সবই ভাগ্য। আমারও একসময় কিছুই ছিল না। আজ এই গাড়ি, এত টাকা—সবই একটা অপমানের জেদ থেকে তৈরি।”
মেয়েটি এবার মুখ ফেরাল, “অপমান?”
জয় স্টিয়ারিংয়ে হাত শক্ত করল। পুরনো ক্ষতটা আজও দগদগ করছে। “হ্যাঁ। কলেজে পড়ার সময় রিয়া নামের একটি মেয়েকে ভালোবাসতাম। ওর বাবা আমাকে ডেকে কুকুর-বেড়ালের মতো অপমান করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘চাষার ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দেব না।’ সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, একদিন আমি ওই লোকটার চেয়েও বড়লোক হয়ে দেখাব। আজ আমি তা পেরেছি। কিন্তু…”
“কিন্তু রিয়াকে পাননি, তাই তো?” মেয়েটির গলার স্বরটা কেমন যেন বদলে গেল। একটু কি ভারী? নাকি ব্যঙ্গাত্মক?
জয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “না। শুনলাম এক কোটিপতির ছেলের সাথে ওর বিয়ে হয়েছে। সুখী হয়েছে নিশ্চয়ই। টাকা থাকলে সব সুখ কেনা যায়।”
হঠাৎ গাড়ির পেছনের বাতাসটা যেন ভারী হয়ে উঠল। মেয়েটি নিচু গলায় বলল, “আপনি ভুল জানেন জয়বাবু।”
জয় চমকে উঠল। ব্রেক কষার উপক্রম করল প্রায়। “আপনি আমার নাম জানলেন কী করে? আমি তো বলিনি!”
মেয়েটি হাসল। সেই হাসিটা বড় করুণ, বড় বিষাদগ্রস্ত। “রিয়াকে আমি চিনতাম। ওর বাড়ি চন্দ্রকোনায়, তাই না? হারান বাবুর মেয়ে?”
“হ্যাঁ! কিন্তু আপনি…”
মেয়েটি বলে চলল, “রিয়ার বিয়ে হয়নি জয়বাবু। বাবার ঠিক করা ওই বড়লোক ছেলের সাথে বিয়েটা ও মেনে নেয়নি। বিয়ের রাতেই ও বাড়ি থেকে পালিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল আপনার কাছে যাওয়া। ও জানত আপনি তখন শহরের মেসে থাকেন। কিন্তু…” মেয়েটি থামল।
জয়ের হৃৎস্পন্দন তখন দ্রুতলয়ে চলছে। “কিন্তু কী?”
“কিন্তু ও পৌঁছতে পারেনি। এইরকমই এক ঝড়জলের রাতে, হাইওয়েতে একটা লরি ওকে পিষে দিয়ে চলে যায়। ও রাস্তায় পড়ে ছিল ঘণ্টা দুয়েক। কেউ গাড়ি থামায়নি। সবাই ভেবেছিল ঝামেলা। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই মেয়েটা মারা যায়।”
চমকে ক্যাঁচ করে ব্রেক কষল জয়। গাড়িটা রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“আপনি… আপনি কে? এসব জানলেন কী করে?” বলতে বলতে জয় দ্রুত পেছনে তাকাল।
কই! পেছনে তো কেউ নেই।
জয় ভালো করে দেখল। পেছনের সিট কভারটা শুকনো খটখটে। কোথাও এক ফোঁটা জল নেই, সিটে কেউ বসার সামান্য ভাঁজটুকুও নেই। যেন কেউ কোনোদিন ওঠেইনি।
জয়ের হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। সে কি এতক্ষণ নিজের মনেই কথা বলছিল?
হঠাৎ গাড়ির বদ্ধ বাতাসের ভেতর থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। সেই কণ্ঠস্বর, যা সে শেষবার শুনেছিল বহু বছর আগে।
“আমি জানি, কারণ আমিই যে রিয়া… মারা যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি রাতে তোমার জন্য এই রাস্তার পাশে অপেক্ষা করেছি। ভেবেছি তুমি একদিন এই পথ দিয়ে ঠিক আসবে, সেদিন তোমাকে সব কথা বলে মুক্তি পাব। আজ কতদিন পরে তুমি এলে জয়! আমাকে কত অপেক্ষাই না করালে…!”
কণ্ঠস্বরটা ক্রমশ বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের সাথে মিশে মিলিয়ে গেল। এক অদ্ভূত নিস্তব্ধতা গ্রাস করল চারপাশ।
“রিয়া! তুমি কোথায় রিয়া?” জয় পাগলের মতো এদিক ওদিক হাতড়াতে লাগল। শূন্য গাড়ির ভেতর তার নিজের গলার আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো শুধু।
কেউ কোত্থাও নেই। বাইরের ঝড়টাও যেন হঠাৎ করেই থেমে গেছে। হাইওয়ের অন্ধকারে শুধু দূরে সিটি হসপিটালের আলোগুলো টিমটিম করে জ্বলছে…
(সমাপ্ত)


