হিমের ঘর
রাত এগারোটা বাজে। ডিনার সেরে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়ে ছিল আকাশ। মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে। চাঁদ মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। সামনের গাছগুলো থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁর ডাক। বহুদূরে দপদপ করে জ্বলছে একখানা ল্যাম্পপোস্ট।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের অনিশ্চিত চিন্তায় মগ্ন ছিল আকাশ। মনের মধ্যে দোলাচল চলছিল। হঠাৎ সমস্ত নীরবতাকে ছিন্ন করে ওর ফোনটা ঝনঝন করে বেজে উঠল। মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল একটা ‘আননোন’ নম্বর ফুটে উঠেছে। নম্বরটা দেখে কোনো আত্মীয়-পরিজনের বলে মনে হলো না।
একটু বিরক্তভাবেই ফোনটা ধরল আকাশ। ঝাঁঝালো গলায় বলল, “হ্যালো, কে?”
ওপাশ থেকে একটা মেয়ের মিষ্টি স্বর ভেসে এল, “হ্যালো রাজু? আমি পায়েল বলছি।”
উফ! বিরক্তিকর। এই দুশ্চিন্তার সময়ে এইসব উটকো কল মোটেই ভালো লাগে না আকাশের। তাই “রং নম্বর” বলেই সে ফোনটা কেটে দিল, অপর পক্ষকে আর কিছু বলার সুযোগ দিল না।
এম.এস. পাস করে একবছর হাউস স্টাফ, তারপর রুরাল বন্ডে একটা হাসপাতালে জয়েন করতে চলেছে আকাশ, হরিনারায়নপুর নামে একটা গ্রাম। আকাশের আদি বাড়ি উত্তর কলকাতায়, সেখানেই ওর জন্ম থেকে বড় হয়ে ওঠা।
রাতের ঘন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নানা চিন্তা আকাশের মাথায় আসছিল। কেমন হবে হরিনারায়নপুর জায়গাটা? ওখানের মানুষরাই বা কেমন হবে? যদিও তিনটে বছর কাটিয়েই সে ফিরে আসবে নিজের শহরে। এখানে সুযোগ-সুবিধা, যশ, খ্যাতি সবকিছুই অনেক বেশি। প্রাইভেট প্র্যাকটিসের স্কোপটাও বেশি। তাছাড়া প্রাইভেট নার্সিংহোম বা সরকারি হাসপাতাল তো আছেই। কিন্তু এই তিনটে বছর গ্রামের পরিবেশের সাথে নিজেকে অ্যাডজাস্ট করতে পারবে তো!
এইসব চিন্তাভাবনায় ওর মেজাজটা একটু খিটখিটে হয়েছিল, সেই অবস্থায় এই কল। একটু রূঢ় ব্যবহারই করে বসল সে, নাহলে হয়তো একটু ভদ্রভাবে কথা বলত। ছাব্বিশ-সাতাশের মতো বয়স হলেও আকাশ এখনও সিঙ্গেল। এতদিন বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকা আকাশের জীবনে প্রেম আসেনি। দু-একজন যে প্রপোজ করেনি তা নয়, তবে কেউই ওর মনের মধ্যে সেভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি। তবে আজকাল মাঝে মাঝে আকাশের মনে হয়, একটা রিলেশন হলে মন্দ হতো না।
এইসব ভাবতে ভাবতে সে বেডরুমে এসে ঢুকল। বিছানা পেতে যখন সে শুয়ে পড়ার উপক্রম করছে, তখনই দ্বিতীয়বার সেম নম্বর থেকে কলটা এল। এবারে সে আর ততটা বিরক্তি দেখাল না। ফোনটা ধরে ভদ্রভাবে বলল, “হ্যাঁ, বলুন।”
মেয়েটা বলল, “সরি, আপনাকে আবার ডিসটার্ব করলাম। কিছু মনে করলেন না তো?”
মেয়েটার গলার স্বর ভীষণ মিষ্টি। আকাশের মনে হলো ফোনের ওপারে যেন সেতার বাজছে। ওর মনের সব বিরক্তি এক নিমিষে উধাও হয়ে গেল। বলল, “আরে না না, ইটস ওকে। আসলে তখন মেজাজটা একটু বিগড়ে ছিল… তাই… আমিই বরং সরি চাইছি।”
মেয়েটা হাসল। বলল, “কী যে বলেন! উটকো ফোন করে জ্বালাচ্ছি আমি, আর সরি বলবেন আপনি?” একটু থেমে বলল, “যাইহোক, ভুল করে যখন কানেক্ট হয়েই গেছে, তখন একটু কথা বলা যায়? মানে… আলাপ করা যায়?”
আকাশ বুঝল মেয়েটা ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইছে। অন্য সময় হলে সে বিশেষ পাত্তা দিত না, কিন্তু আজকে মেয়েটার সঙ্গে কথা বলার একটা ইচ্ছে যেন ওকে পেয়ে বসল। বলল, “নিশ্চয়ই, হোয়াই নট?”
মেয়েটা বলল, “আমি পায়েল… পায়েল বোস। আর আপনি?”
আকাশ বলল, “আমি আকাশ। আকাশ রায়।”
পায়েল খুব মিষ্টি গলায় বলল, “আচ্ছা… গলা শুনে তো বেশ ইয়ং মনে হচ্ছে। আপনি কি সিঙ্গেল নাকি ম্যারেড?”
প্রশ্নটা শুনে মুচকি হাসল আকাশ। ওর মনের ভিতরে ভালোলাগার একটা স্রোত বয়ে গেল। বলল, “একেবারে পিওর ব্যাচেলর। এই জাস্ট চাকরিতে জয়েন করছি। লাইফটা একটু সেটল হোক, তারপর ওসব নিয়ে ভাবব।”
অবাক হওয়া গলায় পায়েল বলল, “ও তাই? গ্রেট! কিসের চাকরি, যদি আপত্তি না থাকে…?”
আকাশ বলল, “ডাক্তারি। কিছুদিনের মধ্যেই একটা হাসপাতালে জয়েনিং আছে।”
এমনই কিছু শোনার প্রতীক্ষাতেই যেন ছিল পায়েল। গলার স্বরে মুগ্ধতা মিশিয়ে বলল, “ওয়াও! ডক্টর? সিরিয়াসলি! ডাক্তারদের জন্য আমার মনে আলাদা একটা রেস্পেক্ট আছে।”
আকাশ বলল, “আর আপনি? স্টুডেন্ট?”
পায়েল বলল, “পড়াশোনা শেষ। এখন একটা প্রাইভেট ফার্মে জব করছি। একা মানুষ, নিজের খরচটা নিজেই চালিয়ে নিই।”
এই একটা কথাতেই আকাশের মনের ভিতরে মেয়েটা যেন অনেকটা জায়গা করে নিল। আকাশ বলল, “ইন্ডিপেন্ডেন্ট মেয়েদের আমি খুব রেস্পেক্ট করি। নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা খুব দরকার।”
পায়েল হাসল। বলল, “কী আর করা যাবে বলুন… যার কেউ নেই, তার ঈশ্বর আছেন।”
পায়েলের সঙ্গে আকাশের পরিচয়ের প্রাথমিক পর্বটা অনেকটা এরকমই ছিল। সেদিন ফোন রাখার আগে পায়েল বলেছিল, “মাঝে মাঝে যদি আপনাকে একটু ফোন করি, প্রবলেম হবে না তো?”
আকাশ বলল, “জয়েন করার আগে পর্যন্ত তো একদম ফ্রি আছি। ফোন করতেই পারেন। আমারও টাইমটা বেশ ভালো কাটবে।”
পায়েল বলেছিল, “ডান। তাহলে এই টাইমেই করব। সারাদিন অফিসের যা প্রেশার থাকে… বুঝতেই পারছেন, এই সময়টাতেই যা একটু হাঁপ ছাড়ি।”
আকাশ বলল, “ঠিক আছে, নো প্রবলেম।”
ফোন কেটে দিল পায়েল। এরপর থেকে রাত ঠিক এগারোটা বাজলেই আকাশের কাছে পায়েলের ফোন আসে। দিনের বেলায় নম্বরটাতে দু-একবার ট্রাই করে দেখেছে আকাশ। ফোন সুইচ অফ বলেছে। এই নিয়ে আকাশ অবশ্য কোনো প্রশ্ন করেনি। কারণ দিনের বেলা অফিসে থাকলে ওর ফোন সুইচ অফ থাকে, এটা পায়েল আগেই বলে দিয়েছিল।
সেদিনের সেই প্রাথমিক পরিচয় কয়েকদিনের মধ্যে সিঁড়ি বেয়ে ক্রমশ গভীর হতে শুরু করেছে। এই ক’দিনে পায়েলের ব্যাপারে অনেক কিছুই জেনেছে আকাশ। পায়েলের বাবা-মা কেউই নেই, একটা অনাথ আশ্রমে মানুষ। নিজের চেষ্টায় একা হাতে লড়াই করতে করতে সে আজ নিজের মাটিটাকে শক্ত করতে পেরেছে। অনেক কুপ্রস্তাব এসেছে জীবনে, সেসব অগ্রাহ্য করে সে ভদ্রভাবে সমাজে বাঁচতে চেয়েছে। শুনতে শুনতে আকাশের কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে পায়েলের উপরে।
সেদিন রাতে পায়েল ফোন করতেই আকাশ জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, তুমি কোথায় থাকো বলো তো? এতদিন কথা হচ্ছে, অ্যাড্রেসটাই জানা হলো না।”
পায়েল হাসল। বলল, “তুমিও তো বলোনি। আগে তুমি বলো… কোথায় থাকো?”
রেগুলার কথা হলেও আকাশ এক্ষুণি নিজের বাড়ির ঠিকানাটা ওকে জানাতে চাইল না। তাই একটু রোমান্টিক সুরে বলল, “সূর্য আর চাঁদের আলোয় ঘেরা একটা বাড়িতে বাবা-মায়ের সাথে থাকি। এবার বলো, তুমি কোথায় থাকো?”
পায়েলও পালটা হেঁয়ালি করেই বলল, “আমি? আমি তো ঠাণ্ডা ঘরের বাসিন্দা, সূর্যের আলো আমায় ছুঁতে পারেনা। আমার বন্ধুদের সাথে থাকি।”“
আকাশ হাসল।পায়েল হয়তো কোনো অনাথ আশ্রমের কথা বলছে, অনুমান করলেও মজা করে বলল, “বাপরে! তুমি কি অ্যান্টার্কটিকায় থাকো নাকি?”
পায়েল বলল, “কে জানে! হতেও পারে।”
হাসতে হাসতে আকাশ বলল, “তাহলে তো আমরা দুই মেরুর বাসিন্দা হয়ে গেলাম।”
গুনগুন করে পায়েল গান ধরল, “না চাহিলে যারে পাওয়া যায়, তেয়াগিলে আসে হাতে…”
তারপরে আরও কয়েকটা দিন কেটে গেছে। ওর হাসপাতালে জয়েনিং-এর তারিখ ক্রমশ এগিয়ে এসেছে। সেদিন রাতে ওর মনটা খুব আনচান করছিল। সবাইকে ছেড়ে যেতে হবে একথা ভাবলেই মনটা কেমন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। সেদিন পায়েল ফোন করতেই, আর থাকতে না পেরে পায়েলকে বলে বসল, “প্রায় দু‘মাস হতে চলল তোমার ভয়েস শুনছি… অথচ মানুষটাকে আজও দেখলাম না। আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই পায়েল।”
আকাশ জানত সে হতাশ হবে, আর হলোও তাই। পায়েল বলল, “এখনই দেখা করা পসিবল না গো আকাশ। আমি নিরুপায়। তবে তুমি তো ডাক্তার, দেখবে একদিন না একদিন ঠিক দেখা হয়ে যাবে।”
আকাশ বলল, “মানে? ডাক্তার হলেই দেখা হবে কেন?”
পায়েল বলল, “ডাক্তারের কাছে তো রোগীকে আসতেই হয়, তাই আমাকেও একদিন তোমার কাছে আসতে হবে।”
আকাশ একটু থমকে গেল। বলল, “কেন? তোমার কি কোনো অসুখ আছে?”
একটু থেমে পায়েল বলল, “হ্যাঁ আকাশ, খুব বড়ো অসুখ। এমন অসুখ… যা কোনোদিন সারে না।”
পায়েলের অসুখটা কী জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না আকাশের। এত সুন্দর একটা মিষ্টি মেয়ে, সে কিনা শরীরে এমন একটা রোগ পুষে রেখেছে যা কখনো সারবে না—এটা ভেবেই ওর মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। সে জানে সব অসুখ সারানোর পদ্ধতি মেডিকেল সায়েন্সেরও জানা নেই। তবু আবেগের সুরে বলল, “তুমি প্লিজ ভেঙো পড়ো না। কথা দিচ্ছি, তোমার অসুখ আমি সারিয়ে তুলব।”
হালকা হেসে পায়েল বলল, “দেখা যাক… তুমি আগে হাসপাতালে জয়েন করো, তারপর আমি তোমার সঙ্গে দেখা করব।”
আকাশ বলল, “প্রমিস?”
পায়েল বলল, “পাক্কা প্রমিস।”
ফোন কাটার পরে খানিকক্ষণ স্তম্ভিতভাবে বসে রইল আকাশ। যাকে সে ভালোবেসে মনের মধ্যে জায়গা দিয়েছিল, তার এরকম একটা অসুখ আছে সেটা সে জানত-ই না। পায়েলকে হারিয়ে ফেলতে হবে ভাবলেই ওর বুকের ভিতরটা যেন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল।
আজ দু’দিন হলো নতুন হাসপাতালে শিফটিং হয়ে এসেছে আকাশ। হাসপাতালটা যতটা খারাপ হবে সে ভেবেছিল, ঠিক ততটাও নয়; বরং বেশ ভালোই বলা যায়। ওটি, মর্গ সবই রয়েছে হাসপাতালে, কেবল ডাক্তারেরই অভাব। সেই একমাত্র ডাক্তার, আর আছে একজন নার্স ও একজন স্টাফ।
কোয়াটারে গোছগাছ করতে করতেই প্রথম দিনটা কেটে গেল। দ্বিতীয় দিন থেকে পুরোদমে কাজে লেগে পড়ল আকাশ। প্রথমে গোটা হাসপাতালটাকে ঘুরে ঘুরে দেখল, তারপর হাসপাতালের স্টাফ রঘুকে নিয়ে মর্গে গেল।
মর্গের একপাশে রয়েছে ফ্রিজার বক্স। বেওয়ারিশ লাশগুলো ওখানেই রাখা থাকে। কয়েকদিন হলো একটা খবর হামেশাই চোখে পড়ছে আকাশের। এইসব গ্রামাঞ্চলের হাসপাতাল থেকে লাশ পাচার আজকাল একটা বড়ো ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানেও সেরকম কিছু হচ্ছে কিনা জানার জন্য রেজিস্টার দেখে ফ্রিজারে রাখা লাশের সংখ্যা সে মিলিয়ে নিতে চাইছিল। কারণ এরপরে কিছু ঘটলে, তার সমস্ত দায় এসে পড়বে আকাশের কাঁধে, আর এইসব ঝুট-ঝামেলা সে মোটেই চায় না।
কিন্তু রঘুকে এইসব বুঝতে দেওয়া যাবে না, তাই ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “রঘু, রেজিস্টারটা নিয়ে এসো তো। দেখি এখানকার ‘অতিথি‘দের কেস হিস্ট্রিগুলো।”
রঘু রেজিস্টার নিয়ে ফিরে আসতেই একের পর এক ফ্রিজারের বক্সগুলোকে টেনে টেনে খুলতে লাগল আকাশ। রেজিস্টার আর ছবি দেখে রঘু লাশগুলোর নাম আর কেস হিস্ট্রি বলে দিতে লাগল।
গোটা চারেক বক্স খোলার পরে সে যখন পঞ্চম বক্সটাতে এসে পৌঁছেছে তখন রঘু বলল, “স্যার, এই কেসটা খুব দুঃখের। আমাদের হাসপাতালে তো ডাক্তার নেই, আপনার আগের ডাক্তারবাবুও ছুটিতে ছিলেন। বিনা চিকিৎসাতেই মেয়েটা মারা গেল। অন্য কোথাও যে নিয়ে যাবে, সেরকমও কেউ ছিল না সেদিন।”
আক্ষেপে মাথা নেড়ে বক্সটা খুলে ফেলল আকাশ। বক্সের ভিতরে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছে একটা মেয়ে। কী জীবন্ত আর নিষ্পাপ লাগছে মেয়েটার মুখখানা।
রঘু বলল, “মেয়েটার নাম পায়েল বসু। পাশের পাড়াতেই থাকত। প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করত। মাস চারেক আগে রাত এগারোটার দিকে ভীষণ জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়… টাইফয়েড। আমি কম্পাউন্ডার হিসেবে যতটা যা জানি, চেষ্টা করেছিলাম স্যার, কিন্তু বাঁচাতে পারিনি। অনাথ মেয়ে, বডিটা নেওয়ার মতোও কেউ আসেনি, তাই এখানেই পড়ে আছে।”
আকাশের ভ্রু কুঁচকে গেল। নামটা বার দুই মনে উচ্চারণ করল—এই পায়েল সেই পায়েল নয়তো! না, তা কীভাবে হয়! যার সঙ্গে তার রোজ কথা হয় সে কীভাবে মৃত হতে পারে?
আকাশ কাঁপা গলায় বলল, “স্ট্রেঞ্জ কো-ইন্সিডেন্স! আমারও পরিচিত একজনের নাম পায়েল, সে-ও প্রাইভেট ফার্মে জব করে, সে-ও অনাথ…”
রঘু অবাক হয়ে বলল, “তাই নাকি? বাড়ি কোথায় তার?”
রঘুর প্রশ্নটা শুনেই হঠাৎ বিদ্যুৎ ঝলকের মতো একটা কথা মনে পড়ে গেল আকাশের, ওর সারা শরীরটা কাঁটা দিয়ে উঠল। পায়েল বলেছিল, ও খুব ঠান্ডা একটা ঘরে ওর বন্ধুদের সাথে থাকে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। এই ফ্রিজারের ভিতরটাও তো খুব ঠান্ডা। এখানেও সূর্যের আলো পৌঁছায় না। তাছাড়া এখানেও তো পায়েলের মতো আরো অনেকেই আছে!
তাড়াহুড়ো করে রঘুকে বলল, “রঘু, পায়েলের কোনো ফোন নম্বর আছে রেকর্ডে?”
রঘু বলল, “হ্যাঁ স্যার, ভর্তির সময় ওর ফোনটা জমা দিয়েছিল, নম্বরটা লেখা আছে ফাইলে।”
নিজের ফোনটাকে বার করে নম্বরটা মিলিয়ে আকাশ জানতে চাইল, “দেখো তো, নম্বরটা এটাই কি না?”
রঘু ফাইল থেকে চেক করে ভ্রু কুঁচকে বলল, “হ্যাঁ স্যার, এটাই তো! কিন্তু আপনি পেলেন কোথায়? ওর ফোন তো কবে থেকে আমাদের স্টোররুমে সুইচ অফ হয়ে পড়ে আছে।”
আকাশের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। রঘুর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ফ্রিজারের বাক্সটাকে ভিতরের দিকে ঠেলে বন্ধ করে দিল ও।
পিছন ফিরতেই শুনতে পেল কে যেন ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলছে, “বলেছিলাম না? তুমি হাসপাতালে জয়েন করো, তারপর দেখা হবে। আমি কিন্তু কথা রেখেছি আকাশ।”
আকাশের বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠল। কী যেন বলার চেষ্টা করল সে। পারল না।
রঘু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “গ্রামের হাসপাতাল স্যার, কেউ দু-তিন বছরের বেশি টিকতে চায় না। ডাক্তারবাবু চলে গেলে আবার সব ফাঁকা। আমাদের মতো গরিবদের জীবনের কোনো দাম নেই স্যার, বিনা চিকিৎসায় মরাটাই আমাদের কপালে লেখা।”
আকাশের চোখের কোণায় একবিন্দু জলের রেখা দেখা দিয়েছে। নিজের প্রিয়জনের বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার দুঃখ আজ বুঝেছে আকাশ, পায়েল ওকে বুঝিয়ে দিয়েছে সেই কষ্ট। মনে মনে ভাবল, পায়েলের এই মৃত্যুকে সে কিছুতেই বৃথা যেতে দেবে না।
রঘুর দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল, “আমি কোথাও যাচ্ছি না রঘু। ট্রান্সফার না হওয়া পর্যন্ত আমি এখানেই থাকব। আর দরকার হলে সারাজীবন এই গ্রামেই প্র্যাকটিস করব, কথা দিচ্ছি… আর কোনো পেশেন্টকে আমি বিনা চিকিৎসায় মরতে দেব না।”


