ঠাকুর্দা ধাঁধা বলতেন—
“আট পা ষোলো হাঁটু,
মাছ ধরতে যায় লাটু,
আকাশেতে পেতে জাল,
মাছ ধরে চিরকাল।”— বলো তো কী?
ঠাকুর্দার কোলে বসে পারমিতা ভাবত, আকাশ মানে তো শূন্যতা। ওখানে মেঘেদের বাড়ি। অনেক ধুলোবালি ওখানে উড়ে বেড়ায়। পাখিরা ওড়ে, পতঙ্গরা ওড়ে। ঠাকুর্দা মারা যাওয়ার পরে মা বলত, ঠাকুর্দা নাকি আকাশের তারা হয়ে গিয়েছেন। সেই আকাশের বুকে জাল ফেলে মাছ ধরে কে? সে কি ভগবান? ফোকলা দাঁতে হেসে ঠাকুর্দা বলতেন, “না দিদিভাই, ওরা মাকড়সা।”
“মাকড়সা!” হেসে উঠত পারমিতা, “আটটা পা আর ষোলোটা হাঁটু! ইস, আমি ভাবছিলাম ভগবান!”
পারমিতা হাসত। কিন্তু ওর মনের কোনো এক গোপন কোণে আস্তে আস্তে ভগবানের আরেক প্রতিচ্ছবি রূপে মাকড়সারা জাল বুনছিল। একটু বড় হওয়ার পর ওর শখই হয়ে গেল মাকড়সা ধরা। অজস্র মাকড়সা ধরে ধরে কৌটোর ভেতর বন্দি করে রাখত ও। জুলজি নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন পাস করার পরে এই নেশা আরও বেড়ে গেল।
ওদের বাড়ির কোণের দিকের একটা হলঘরকে মাকড়সাদের সংগ্রহশালা বানিয়ে ফেলল পারমিতা। দেশ-বিদেশের অজস্র মাকড়সা কালেকশন করত সে। কৌটোর ভেতরে রেখে বাইরে মাকড়সার সাধারণ নাম আর সায়েন্টিফিক নামসহ লেবেল সেঁটে দিত। যেসব প্রজাতির নাম এখনো জানা যায়নি, তাদের নাম রাখত নিজেই। বান্ধবীরা ওকে বলত লিনিয়াসের উত্তরসূরি।
দেখতে দেখতে ওর শরীরে যৌবন এল, কিন্তু প্রেম কখনো ওর জীবনে এল না। কলেজে পড়াকালীন ওর প্রিয় বান্ধবী ছিল সায়নী। একমাত্র সায়নীর সঙ্গেই পারমিতার সবচেয়ে ভালো বন্ধুত্ব ছিল। বাকি ছেলেমেয়েরা ওর ধারেকাছেও ঘেঁষত না। ছেলেরা বলত, “এরকম ডেঞ্জারাস মেয়ের সঙ্গে প্রেম করা যায় নাকি?” আর মেয়েরা বলত, “তুই বড্ড অদ্ভুত!”
হ্যাঁ, ডেঞ্জারাস আর অদ্ভুত—দুটো বিশেষণই ওর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পারমিতা যেসব মাকড়সা কালেকশন করে রাখত, তাদের সবাই মোটেই নিরীহ ছিল না। কয়েকটা তো ছিল গোখরো সাপের মতোই বিষধর। কিন্তু নিজের পোষ্যদের নিয়ে সে খুব খুশি ছিল। একদিন একটা মাকড়সার কামড়ও খেয়েছিল, সৌভাগ্যক্রমে সেটা খুব একটা বিষাক্ত ছিল না, তাই রক্ষে। সায়নী খুব বকেছিল সেদিন। বলেছিল, “দেখবি, একদিন এই মাকড়সার কামড়েই তুই মরবি।”
পারমিতার জীবনে প্রেমের আবির্ভাব না হলেও, শরীরলোভীদের দৃষ্টি ও এড়াতে পারল না। ওর স্বভাব ছিল বাউণ্ডুলে গোছের। পোশাক-আশাকের ব্যাপারে কখনোই সচেতন থাকত না, তাই মাঝে মাঝেই রকে বসা ছেলেদের কাছে টোন খেত। অবশ্য সেসব পাত্তা দেওয়ার মতো মেয়ে পারমিতা ছিল না। কিন্তু আজ যখন রোহিতদা ওর পথ আটকে দাঁড়াল, বেশ ভয় পেয়ে গেল ও।
পাড়ার মোড়ে একটা চায়ের দোকানের সামনে বসে রোহিতদারা আড্ডা দেয়, আর পথচলতি মেয়ে দেখলেই টোন মারে। এদের কেউই সাধারণ পরিবারের ছেলে নয়। কারও বাবা বিজনেসম্যান, কারও বাবা ডাক্তার, আবার কারও বাবা পার্টির বড় নেতা। এদেরই পাণ্ডা হলো রোহিতদা। এরা কোনো মেয়েকে দাঁড়াতে বললে, ভয়েই হোক বা অন্য কোনো কারণে, সাধারণত কেউ ওদের এড়িয়ে চলে না। এরা নিজেদের খুশি মতো মেয়েটাকে নিয়ে ফুর্তি করে, তারপর ছেড়ে দেয়। অবশ্য লিমিট ক্রস কখনোই করেনি।
কিন্তু পারমিতা কারও হাতের পুতুল হয়ে খেলতে রাজি ছিল না। তাই সেদিন যখন রোহিতদা ওকে দাঁড়াতে বলেছিল, ও গ্রাহ্য করেনি। আজ কি তারই প্রতিশোধ নেবে রোহিতদা? পারমিতার বুক কাঁপতে লাগল।
পান চিবোতে চিবোতে রোহিতদা জিজ্ঞেস করল, “কী নাম তোর?”
নিচু গলায় পারমিতা বলল, “আমার নাম পারমিতা। আমার পথ আটকেছ কেন? যেতে দাও।”
রোহিতদা হাসল, “তোর পিঠে দুখানা ডানা গজিয়েছে মনে হচ্ছে! আমাকেও গ্রাহ্য করছিস না। আজ এখানে তোর কাপড় খুলে আমরা তোর ন্যাংটো নাচ দেখব।”
পারমিতার মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। চিৎকার করে বলল, “জানোয়ার! তোর বাড়িতে মা-বোন নেই?”
রোহিতদা মুখ বিকৃত করে বলল, “ছি ছি! মা-বোনের কাছে এসব দেখা যায় নাকি? এগুলো তো বউ দেখাবে। নাও সোনা আমার, আমাকে একটা কিস দাও দেখি।”
বলেই হাসতে হাসতে গালটা বাড়িয়ে দিল রোহিতদা। নিজের হাতটাকে আর সামলে রাখতে পারল না পারমিতা। সপাটে রোহিতদার গালে একটা চড় কষাল। চোখ লাল করে ওর দিকে তাকাল রোহিতদা।
“তোর এত বড় সাহস তুই আমাকে থাপ্পড় মারলি? এরপরও তুই আমাদের হাত থেকে বাঁচার আশা করিস!”
ওকে জড়িয়ে ধরল রোহিতদা। বাঁচার শেষ অস্ত্র হিসেবে রোহিতের তলপেট লক্ষ্য করে সজোরে একটা লাথি চালাল পারমিতা। রোহিতদা ‘ক্যাঁক’ শব্দ করে বসে পড়তেই সে দৌড় লাগাল।
ছুটতে ছুটতে নিজের বাড়িতে এসে পৌঁছাল পারমিতা। ওকে দেখে ওর বাবা অবাক হয়ে গেলেন।
“কী হলো রে? এভাবে হাঁপাচ্ছিস কেন?”
পারমিতা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আজকে রোহিতদা আমার পথ আটকেছিল।”
বাবার গলা কেঁপে উঠল, “ইস! ওরা মেয়েগুলোকে একটু শান্তিতে থাকতে দেবে না। কিছু করেনি তো?”
“কিচ্ছু করার সুযোগ দিইনি। তার আগেই ওকে লাথি মেরে আমি চলে এসেছি।”
পারমিতার বাবা চমকে উঠলেন, “এটা কী করলি তুই মা? জানিস তো ওরা কত ডেঞ্জারাস ছেলে! ওরা সবরকম ক্ষতি করতে পারে। কাল ওদের কাছে গিয়ে তুই ক্ষমা চেয়ে আসবি।”
পারমিতা অবাক হলো, “এ কী বলছ বাবা? আমি তো খারাপ কিছু করিনি, তাহলে ক্ষমা চাইব কেন? তাও ওই নোংরা ছেলেগুলোর কাছে?”
বাবা অসহায় গলায় বললেন, “দ্যাখ মা, এখন পার্টি, প্রশাসন সবই ওদের দিকে। ওদের অত্যাচার মেনে নেওয়া ছাড়া আমাদের অন্য কোনো উপায় নেই। আমি তোকে হারাতে চাই না মা। প্লিজ, কাল ওদের কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিবি।”
উত্তর না দিয়ে নিজের ঘরের ভেতর ঢুকে গেল পারমিতা। সবাই এভাবে ওদের মাথায় চড়িয়ে রেখেছে বলেই ওরা এত দূর ওঠার সুযোগ পেয়েছে। নিজের বাবাকেও ওর কাপুরুষ বলে মনে হলো।
সায়নীকে ফোন করে গোটা ঘটনাটা খুলে বলল পারমিতা।
সায়নী আঁতকে উঠল, “ওদের সঙ্গে লাগতে যাওয়া তোর উচিত হয়নি। ওদের সঙ্গে ঝামেলা করার পর গত তিন মাসে এই এলাকায় তিনটে মেয়ে নিখোঁজ হয়ে গেছে, এই খবরটা জানিস তো? ঘটনাগুলোর একটারও তদন্ত হয়নি। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী ঘটনাগুলোকে ‘তুচ্ছ’ আর ‘সাজানো’ বলে এড়িয়ে গিয়েছেন। তারপরও তুই কীভাবে ওদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়ানোর সাহস পেলি, ভেবেই তো আমি অবাক হচ্ছি! এক কাজ কর, তুই কিছুদিনের জন্য এলাকা ছেড়ে চলে যা। অবস্থা স্বাভাবিক হলে আবার ফিরিস।”
ফোন কেটে খানিকক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল ও। না, নিজের এলাকা ছেড়ে সে কোথাও যাবে না। তাতে ওর যা হওয়ার হবে! দরকারে একবার পুলিশকে ইনফর্ম করে রাখতে হবে।
পরদিন বিকেলে থানায় গেল পারমিতা। সব শুনে ওসি বললেন, “ছেলেগুলো কি এমনি এমনি তোমার পথ আটকেছিল? নিশ্চয়ই তুমি কিছু করেছিলে।”
পারমিতা তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “আপনি আমার দোষ দেখছেন স্যার? ওরা আমাকে একদিন দাঁড়াতে বলেছিল, আমি দাঁড়াইনি। এটা কি আমার দোষ?”
ওসি নির্লিপ্ত গলায় বললেন, “কেন দাঁড়ালে না? দাঁড়ালে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেত?”
পারমিতার মাথায় রক্ত উঠে গেল। বলল, “ওরা আমাকে নিয়ে ফুর্তি করবে, আর আমাকে সেটা সহ্য করতে হবে? যদি আমি আপনার মেয়ে হতাম, আপনি কি এই কথাটা আমাকে বলতে পারতেন?”
ওসি বিরক্তি প্রকাশ করলেন, “এফআইআর নেওয়ারও কিছু প্রসিডিওর আছে। নিজের মেয়ে হলেও এগুলো আমাকে জিজ্ঞেস করতে হতো।”
পারমিতা হতাশ স্বরে বলল, “ফালতু কথা ছাড়ুন। আপনি কি আমাকে বাঁচানোর জন্য কোনো হেল্প করতে পারবেন? পারলে বলুন, নাহলে আমাকে অন্য ব্যবস্থা দেখতে হবে।”
ওসি মাথা নামালেন, “আমি অপারগ। আমি নিজের মাথাটাকেই বাঁচাতে পারছি না। গতমাসে ওরা থানায় ঢুকে আমার মাথা ফাটিয়ে দিয়ে চলে গেল, আমি কিচ্ছু করতে পারলাম না। তোমাকে কীভাবে বাঁচাব?”
“আচ্ছা, ধন্যবাদ,” বলে থানা থেকে বেরিয়ে এল পারমিতা। নিজেকে ভীষণ একা আর হতাশ লাগল ওর। মনে হলো রোহিতদার সঙ্গে ঝামেলা করে সত্যিই সে ভুল করে ফেলেছে। ওর মতো আরও পাঁচজন মেয়ে যখন এই ব্যাপারগুলোকে এত সহজে মেনে নিচ্ছে, তখন ওরই বা কী দরকার ছিল প্রতিবাদ করতে যাওয়ার?
কয়েকদিন বাড়ি থেকে বেরোল না পারমিতা। নিজের পোষ্যদের নিয়ে মেতে রইল। কয়েকদিন আগে ওর এজেন্ট ওকে একটা অজানা প্রজাতির মাকড়সা এনে দিয়েছে। মাকড়সাটা ব্রাজিলিয়ান ফোনেটরিয়া (Phoneutria) মাকড়সার কাছাকাছি, তাই পারমিতা তার নাম দিয়েছে ‘ফোনেসুরিয়া’। সম্ভবত এই মুহূর্তে এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত মাকড়সা। পারমিতা আদর করে এর ডাকনাম রেখেছে ‘টাইগার’।
গত কয়েকদিন ধরে এই মাকড়সাটাকেই বশে আনার চেষ্টা করছিল ও। ভেবেছিল কিছুদিন বাড়িতেই আত্মগোপন করে থাকবে, যাতে রোহিতদারা ভাবে সে কোথাও চলে গিয়েছে। কিন্তু পারল না। আজ ওকে বাড়ি থেকে বেরোতেই হলো। আজ সায়নীর জন্মদিন, ওকে ইনভাইট করেছে। না গেলে সায়নী বলেছে আর কোনোদিনও ওর সঙ্গে কথা বলবে না। ড্রেস চেঞ্জ করে রেডি হয়ে নিল পারমিতা। একটা ছোট্ট কৌটোর ভেতর টাইগারকেও নিয়ে নিল।
বার্থডে পার্টি থেকে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বেজে গেল। সায়নী বারবার ওদের বাড়িতে থেকে যেতে বলেছিল, কিন্তু সে শোনেনি।
রাস্তায় বেরিয়েই বুঝতে পারল মস্ত হঠকারিতা করে ফেলেছে। শুনশান রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে ওর বুক দুরদুর করে কাঁপতে লাগল। মন্দির পেরিয়ে চকের কাছে একটা পোড়ো বাড়ির সামনে আসতেই সে থমকে দাঁড়াল। বুঝতে পারল তিন-চারটে লোক ওর পিছু নিয়েছে। ভয় পেয়ে ছুটতে লাগল পারমিতা। কিন্তু বেশি দূর যেতে পারল না। হঠাৎ অন্ধকারে কেউ ওকে সামনে থেকে ধাক্কা মারল। মাটিতে দড়াম করে আছড়ে পড়ল পারমিতা, মাথায় চোট লাগল। চাঁদের আবছা আলোয় বুঝতে পারল ওর ঠিক সামনে রোহিতদা দাঁড়িয়ে আছে।
কদর্য ভাষায় খিস্তি মেরে রোহিতদা বলল, “খুব বাড় বেড়েছে না তোর? আমাকে লাথি মারা! আমাদের বিরুদ্ধে থানায় কমপ্লেইন করতে যাওয়া! আজ তোকে বোঝাব তেজ কীভাবে মেটাতে হয়।”
পারমিতার গলা জড়িয়ে এসেছে। কাঁদো কাঁদো গলায় সে বলল, “প্লিজ রোহিতদা আমাকে ছেড়ে দাও, আমাকে যেতে দাও।”
খিকখিক করে হেসে রোহিতদা বলল, “ছাড়ব তো বটেই। তবে তার আগে আমার অপমানের পুরো বদলাটা নিয়ে নেব।”
পারমিতা ফুঁসিয়ে উঠল, “আমাকে স্পর্শ কোরো না রোহিতদা, নাহলে এর পরিণাম তোমাকে জীবন দিয়ে শোধ করতে হবে।”
পারমিতার পেটে সজোরে একটা লাথি মারল রোহিত।
“আমার জীবন নিবি তুই? তার আগে তো তোকেই শেষ করে দেব। আজ পৃথিবীর কোনো শক্তি তোকে আমার কাছ থেকে বাঁচাতে পারবে না।”
লাথি খেয়ে কঁকিয়ে উঠল পারমিতা। ওর গলার স্বর যেন হারিয়ে যেতে লাগল। ততক্ষণে বাকি চারজন লোক সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। ওরা চারজনে মিলে ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে পোড়ো বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। ভয়ে তখন নড়াচড়া করার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে পারমিতা। বহু কষ্টে হাত নামিয়ে পকেট হাতড়ে সে ছোট্ট কৌটোটা বার করল।
ওর মুখে কাপড় গুঁজে দিয়েছে রোহিতদা। চিৎকার করার উপায় আর ওর নেই। স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে শুয়ে বুঝতে পারল, ছুরি দিয়ে ওর জিন্স কেটে ফেলেছে রোহিত। হাতের কৌটোটা খোলার চেষ্টা করল পারমিতা। পারছে না, হাত পিছলে যাচ্ছে। পাশবিক উল্লাসে মেতে উঠেছে রোহিতদা। গা ঘিনঘিন করে উঠল পারমিতার।
কৌটো খুলে বহু কষ্টে মাকড়সাটাকে বার করে ফেলল সে। এই মুহূর্তে মাকড়সাটা ওর তালুবন্দি। এটাকে কি রোহিতদার দিকে ছুড়ে মারবে? কিন্তু ছুড়ে মারলেই কি মাকড়সাটা ওকে কামড়াবে? আর কামড়ালেও যে বাকি চারজন ওকে ছেড়ে দেবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। কী করবে সে?
অসহ্য যন্ত্রণায় পারমিতা হাত মুঠো করল। আর ঠিক তখনই হাতের তালুতে একটা তীক্ষ্ণ কামড় অনুভব করল। পারমিতার শরীর শিথিল হয়ে আসছে। ও বুঝতে পারছে ওর আয়ু আর বেশিক্ষণ নেই। রোহিতদাকে আর বাধা দিল না পারমিতা। ওর চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। জ্ঞান হারানোর ঠিক আগে মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত, শীতল শান্তি অনুভব করল সে।
পরদিন সকালের খবরের কাগজে একটা টুকরো সংবাদ প্রকাশিত হলো—
“আজ সকালে চকের কাছে একটা পোড়ো বাড়ি থেকে এক তরুণীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, মেয়েটিকে গণধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। এই ঘটনায় রাজ্যের বর্তমান শাসক দলের কয়েকজন সদস্যের নাম জড়িয়েছে। গোটা রাজ্য জুড়ে আজ ধিক্কার ও মোমবাতি মিছিল শুরু হয়েছে। যদিও মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন ঘটনাটি বিরোধীদের চক্রান্ত এবং তিনি দোষী হিসেবে বিরোধীদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিয়েছেন। মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।”
ময়নাতদন্তের রুম থেকে বেরিয়ে মুচকি হাসলেন ডক্টর সেন। আজ তিনি ভীষণ শান্তি পেয়েছেন। এই নিয়ে তিন-তিনটে ধর্ষণ কেসে তাঁকে মিথ্যে সুইসাইড রিপোর্ট বানাতে হবে। নিজের সততাকে জলাঞ্জলি দিয়ে বারবার মিথ্যে রিপোর্ট বানাতে তাঁর একেবারেই ভালো লাগত না। কিন্তু নিজের চাকরি বাঁচাতে বাধ্য হয়ে কাজটা তাঁকে করতে হতো, কারণ তাঁর সিনিয়র, স্বয়ং হেলথ মিনিস্টার ডক্টর পালের চাপ ছিল মাথার ওপর। এই কেসেও মিথ্যে রিপোর্ট বানাবেন তিনি, তবু আজ তিনি খুব খুশি।
তাঁকে দেখে ডঃ পাল এগিয়ে এলেন, “পোস্টমর্টেম শেষ তো? এই বোকা মেয়েগুলোর এর চেয়ে ভালো পরিণতি হওয়া সম্ভব নয়। রিপোর্টে কী লিখবেন, সেই নিয়ে আপনাকে তো আর নতুন করে বলার কিছু নেই?”
ডঃ সেন মাথা নাড়লেন। ভেবেছিলেন কথাটা গোপন রাখবেন, কিন্তু পারলেন না। ডঃ পালের দিকে তাকিয়ে বলেই ফেললেন, “ভিকটিম কিন্তু বোকা নয় স্যার, মারাত্মক বুদ্ধিমতী। ওর মৃত্যু ধর্ষণের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে হয়নি। ভিকটিম তাদের ধর্ষণ করতে অ্যালাউ করেছে।”
ডঃ পালের চোখ কপালে, “এ আপনি কী বলছেন! তাহলে মেয়েটি মারা গেল কীভাবে?”
ডঃ সেন শান্ত গলায় বললেন, “মাকড়সার কামড়ে।”
ডঃ পাল চমকে উঠলেন, “আমার কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না। ভিকটিম মাকড়সা পেল কোথায়?”
“পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভিকটিমের পাশে একটা কৌটো পাওয়া গেছে,” ডঃ সেন বলে চললেন, “আমার ধারণা ভিকটিমের সঙ্গেই ওই কৌটোটা ছিল, যার ভেতর মাকড়সাটা বন্দি ছিল। ও ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের হাতে মাকড়সার কামড় খেয়েছে এবং ধর্ষণকারীদের অ্যালাউ করেছে। এটা একটা সূক্ষ্ম জাল—নিজের জীবনটাকে উৎসর্গ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এদের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া। সমাজ থেকে জঞ্জালগুলোকে সাফ করতে এরকমই একজনকে দরকার ছিল।”
ডঃ পাল ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন, “কী উল্টোপাল্টা কথা বলছেন আপনি! আমাকে গোটাটা বুঝিয়ে বলুন।”
একটা পৈশাচিক হাসি হেসে ডঃ সেন বললেন, “আমি রিসেন্ট ‘ফোনেটরিয়া’ গোত্রের এক বিশেষ প্রজাতির ব্রাজিলিয়ান মাকড়সার ব্যাপারে গবেষণা করছিলাম। এই মাকড়সারা শরীরে তেজস্ক্রিয় যৌগ উৎপন্ন করতে পারে। এরা এতটাই বিষাক্ত যে, যার শরীরে কামড় দেয় তাকে শুধুই মেরেই ফেলে না, তার শরীরের জেনেটিক্যাল চেঞ্জ ঘটিয়ে দেয়। এই বিষাক্ত রোগীর রক্তের সংস্পর্শে এলে বা যৌনসংগম করলে, অপর ব্যক্তির শরীরেও সেম জেনেটিক্যাল চেঞ্জ ঘটে যায়। যে পাঁচজন ওকে ধর্ষণ করেছে, তারা কিন্তু জানতেও পারছে না তাদের শরীরে ইতিমধ্যেই জেনেটিক্যাল চেঞ্জ ঘটে গিয়েছে এবং শরীরের ভেতর ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে বিষাক্ত এক শ্রেণির ক্যানসার—যার কোনো প্রতিষেধক এই পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি।”
“ও মাই গড!” শিউরে উঠলেন ডঃ পাল।
মাটিতে বসে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তেই ওনার পকেটে ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে স্ত্রীর নাম। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল ডঃ পালের স্ত্রীর আতঙ্কিত গলা,
“আজ রোহিতের শরীরটা ভীষণ খারাপ! সকাল থেকে ঠিকই ছিল, হঠাৎ কী যে হলো… ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি, তুমি তাড়াতাড়ি একবার এসো…”
(সমাপ্ত)


