জিগালো রহস্য

(১)
রাজুর কোমর জড়িয়ে ধরে মেয়েটা বলল, “পুরো দেড় বছর আমি উপবাসী। আস্তে আস্তে আমার শরীরের ভিতরে ঢুকে পড়ে আমাকে তৃপ্ত করো।”
মেয়েটার গায়ের পোশাক খুলে ফেলল রাজু। এই প্রথমবার সে মেয়েটার সঙ্গে মিলিত হবে। এর আগে পাঁচ-ছ’বার মেয়েটার কাছে এসেছে, প্রতিবারই খানিকক্ষণ গল্প করে মেয়েটা ওকে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু পুরো তিন হাজার টাকাই ওকে পে করেছে, একটি পয়সাও কম দেয়নি। এর মতো কাস্টমার আরও বেশ কিছু আছে রাজুর।
প্রত্যেকেই এক একটা ক্যাটাগরির আইটেম। কেউ কেবল ফোর-প্লে’তেই তৃপ্ত হয়, আবার কেউ পশ্চাৎ মৈথুনে; কিন্তু কেবল গল্প করে তৃপ্ত হওয়ার মতো মেয়ে একটাও দেখেনি রাজু। তাই গত কয়েকদিন সে বেশ অবাকই ছিল। অবশ্য অনেক মেয়েরই কাউকে নিজের শরীরে একসেপ্ট করতে একটু টাইম লাগে, তাই ব্যাপারটা নিয়ে খুব একটা গ্রাহ্য করেনি সে।
প্যাকেট কেটে কন্ডোম বার করল রাজু। মেয়েটা বিছানায় শুয়ে পড়েছে। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে। রাজু ফোর-প্লে শুরু করার আগেই মেয়েটা ওকে টেনে নিজের শরীরে মিশিয়ে নিল। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট একটানা চলার পরে মেয়েটার চোখের জল মুছিয়ে দিল রাজু।
চন্দ্রানী দি’র সংস্থায় ওর দমই সব চেয়ে বেশি, তাই রেটও একটু চড়া। ম্যাক্সিমাম ‘নিম্ফো’দের নিয়ে ওকে কারবার করতে হয়। অনেক আঁচড়-কামড়ের দাগ ওর শরীরে রয়েছে। তবে সে সব নিয়ে রাজু কেয়ার করে না। টাকা উপার্জন করতে হলে এগুলো একটু-আধটু সহ্য করতে হবে বৈকি।
রাজুর ঠোঁটে চুমু খেয়ে মেয়েটা বলল, “হয়ে গেছে?”
রাজু বলল, “হুম। তোমার কি আরও দরকার?”
রাজুকে নিজের শরীরে চেপে ধরে পিষ্ট করতে করতে মেয়েটা বলল, “না, ঠিক আছে। আরও কিছুক্ষণ এভাবে থাকো।”
মেয়েটার কাঁধের পাশে মুখ রাখল রাজু। ঠিক তখনই শরীরে একটা প্রবল চাপ অনুভব করল। একটা হাতি কিংবা অজগর সাপ মানুষকে পেঁচিয়ে ধরলে যতটা চাপ হয়, এটাও অনেকটা তেমনই। ওর দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করল রাজু।
(২)
শুভকে গাড়িতে চাপিয়ে ডিকে বলল, “কোথায় যাচ্ছি বল তো?”
শুভ বলল, “নতুন কোনো কেস, সেটা তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু ব্যাপারটা কী?”
ডিকে হাসল। বলল, “জিগালো কাদের বলে জানিস?”
শুভ মাথা নাড়ল। বলল, “না, নামটা শুনেছি তবে। ওটা কি মাইলো গোত্রীয় কোনো খাবার?”
হো হো করে হেসে উঠল ডিকে। বলল, “তোর বুদ্ধিকে বলিহারি! জিগালো হলো সেই সব পুরুষ, যারা টাকার বিনিময়ে মেয়েদের তৃপ্ত করে।”
চোখ গোল গোল করে ডিকের দিকে তাকাল শুভ। বলল, “ইউ মিন মেল প্রস্টিটিউট?”
ডিকে হাসল। দেখতে দেখতে ওদের গাড়িটা একটা দোতলা বাড়ির সামনে থামল। বাড়িটার ওপরে হোর্ডিং দিয়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে— ‘ফ্রেন্ড ফাইন্ডার’।
শুভ বলল, “এই সংস্থাটার অ্যাডভারটাইজমেন্ট পেপারে পড়েছি। এরা টাকার বিনিময়ে ছেলে-মেয়েদের বন্ধু খুঁজে দেয়।”
ডিকে বলল, “এদের বাইরের বিজনেস বন্ধু খুঁজে দেওয়া হলেও এর পেছনে এরা একটা আলাদা বিজনেস চালায়, সেটা হচ্ছে মেল প্রস্টিটিউশন। অনেক বড় বড় ঘরের সুন্দরী মহিলারা এদের কাস্টমার।”
কথা বলতে বলতে ওরা ঘরের ভেতরে গিয়ে ঢুকল। ঘরের বামপাশে একটা পর্দা খাটানো ঘর আছে, ওটাই সম্ভবত অফিস। পর্দার বাইরে গিয়ে চাপা গলায় ডিকে বলল, “মে আই কাম ইন?”
ভেতরের থেকে এক মহিলা সুরেলা গলায় বলে উঠলেন, “আসুন আসুন, আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করে আছি।”
ওরা রুমের ভেতরে ঢুকল। রুমটা বেশ সাজানো-গোছানো; অফিস না বলে বরং বাগান বলা ভালো। রুমের চারপাশে বিভিন্ন ধরনের গাছ, জানলাগুলো পর্যন্ত বাদ যায়নি। রুমের মাঝে একটা বেশ বড়সড় টেবিল। তাতে একটা আদ্যিকালের ল্যান্ডফোন নামানো।
টেবিলের এপাশে বেশ কয়েকটা চেয়ার রয়েছে। আর ওপাশে একটা চেয়ারে ল্যাপটপ নিয়ে যিনি খুটখুট করছেন, তাঁর বয়স মোটামুটি চল্লিশের কোঠায়। মুখে হালকা মেকআপ করা। বেশ সুশ্রী লাগছে ভদ্রমহিলাকে। ডিকের দিকে তাকিয়ে ভদ্রমহিলা একটু হাসলেন। বললেন, “দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন।”
ওরা চেয়ারে গিয়ে বসল। ভদ্রমহিলা বললেন, “আমিই আপনাকে ফোন করেছিলাম। আমার নাম চন্দ্রানী সেন।”
ডিকে বলল, “আপনি তো আমাকে চেনেন বললেন। আর ও শুভ, আমার সহকারী।”
শুভর দিকে তাকিয়ে চন্দ্রানী বললেন, “গল্পবইয়ে পড়েছি গোয়েন্দাদের সহকারী থাকে, আজ নিজের চোখে দেখলাম।”
ডিকে বলল, “আচ্ছা, কেসটা কী বলুন? কী জন্য ফোন করে ডেকেছেন?”
চন্দ্রানী বললেন, “আমাদের সংস্থার এক কর্মী গত দুদিন ধরে নিখোঁজ, তার খবর এনে দিতে হবে।”
“আচ্ছা,” ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, “আমাকে আগে আপনাদের সংস্থার ব্যাপারে খুলে বলুন, এটা জানা থাকলে আমার কাজ করতে সুবিধে হবে।”
চন্দ্রানী বললেন, “আমাদের সংস্থায় কর্মীরা সকলে স্বাধীনভাবে কাজ করে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা রেট আছে। কাস্টমাররা আমাদের সংস্থায় এসে একটা এন্ট্রি ফি দিয়ে কর্মীদের বুক করে, অনলাইনেও এই কাজটা করা যায়। যদি কেউ সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটেও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা তাদের রেসপন্স করি, সেক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমেও এন্ট্রি পেমেন্ট করার ব্যবস্থা থাকে।”
ডিকে মাথা নাড়ল। চন্দ্রানী বললেন, “কাস্টমাররা এন্ট্রি পে করার পরে আমরা আমাদের কর্মীদের ছবি, তার অ্যাপ্রক্সিমেট এফোর্ট আর রেট তাদের জানিয়ে দিই। এবারে কাস্টমার তাদের পছন্দমতো পার্টনার চুজ করে। আমরা ওদের কন্টাক্ট নম্বর দিয়ে দিই, ওরা নিজেরাই যোগাযোগ করে। এটা নিয়ে আর আমরা মাথা ঘামাই না। আমরা আর পাঁচটা সংস্থার মতো কর্মীদের কাছ থেকে কমিশন নিই না। তবে বিশেষ বিশেষ কর্মী বেশ জনপ্রিয় হয়ে যায়, যাদের জন্য আমাদের বিজনেস খুব ভালো হয়।”
ডিকে বললেন, “আচ্ছা, যদি কেউ আপনাদের দেওয়া কাস্টমারের বাইরে নতুন কোনো কাস্টমারকে সার্ভিস দেয়, তখন কী করেন?”
চন্দ্রানী বললেন, “এইসব ব্যাপারে অনেক সেফটি থাকে। জেনারেলি কাস্টমাররা ডাইরেক্ট কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে না। তবু যদি কেউ এরকম করছে খবর পাই, সেক্ষেত্রে কাস্টমারকে ফোন করে একটু ট্রিট দেওয়া হয়, তাহলেই কাজ হয়ে যায়।”
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, “আচ্ছা, এবারে নিখোঁজের ব্যাপারে বলুন।”
চন্দ্রানী বললেন, “আমাদের কাস্টমাররা যে সবাই খুব ভদ্র তা নয়, অনেক কাস্টমার আছে যারা কর্মীদের ওপরে অত্যাচার করে স্যাটিসফ্যাকশন পায়। তাদের শরীরে আঁচড়ে-কামড়ে রক্তাক্ত করলে তাদের শান্তি হয়। এইসব বিকৃত মস্তিষ্ক কাস্টমারদের সামলানোর জন্য স্পেশাল কিছু কর্মী আমাদের সংস্থায় আছে, এদের একজন হচ্ছে রাজু। ওর রেট অনেক বেশি, তাছাড়া ওর এনার্জি লেভেল বেশি বলে ওর পপুলারিটি আছে। ওর জন্য অনেক কাস্টমার আমাদের সংস্থায় যোগাযোগ করে।”
“যাই হোক, পরশু রাতে আমার সঙ্গে রাজুর শেষ কথা হয়েছিল, তারপর থেকে ওর ফোন সুইচ অফ আসছে। ভেবেছিলাম হয়তো কাজ ছেড়ে ও বাড়িতে চলে গেছে, এসব কাজে বেশিদিন কেউ টেকে না। তবে অনেক নতুন নতুন কর্মী আসে বলে আমাদের কর্মীর অভাব হয় না। আজ সকালে ওর বাড়ি থেকে ওর ভাই আমাদের সংস্থায় এসেছিল ওর খবর নিতে। সেও নাকি দাদাকে ফোনে পাচ্ছে না। আর ওর বাবা মৃত্যুশয্যায়, ওকে একবার দেখতে চাইছেন। তারপরই আপনাদের আমি ফোন করলাম। যদি ওর কোনো খবর এনে দিতে পারেন খুব ভালো হয়।”
ডিকে বলল, “রাজু থাকত কোথায় এখানে?”
চন্দ্রানী বললেন, “পুরানোপট্টির একটা মেসে। ওর ঠিকানায় খোঁজ নিয়েছি। ওখানে ওর রুমমেটরা বলেছে দুদিন আগেই রাজু বেরিয়েছে, এখনো ফেরেনি।”
ডিকে বলল, “আচ্ছা, ওর একটা ছবি আর ফোন নম্বরটা আমাকে দিন, কী করা যায় আমি দেখছি।”
চন্দ্রানী মাথা নাড়লেন। ড্রয়ার থেকে ছবি বার করতে করতে বললেন, “আপনাকে কত দিতে হবে?”
ডিকে বলল, “খরচ-খরচার জন্য পাঁচ দিন। এরপর খবর নিয়ে দেখি, কেসটা কেমন সেই অনুযায়ী বাকি রেট হবে। যদি কোনো জেনারেল কেস হয়—ধরুন ও কোথাও চলে গিয়েছে, কিংবা অন্য কোনো সংস্থা ওকে হাইজ্যাক করেছে—এরকম হলে আর দশ নেব। আর যদি কোনো ক্রাইম কেস হয়—ধরুন কেউ ওকে খুন করেছে কিংবা কিডন্যাপ করেছে—সেক্ষেত্রে আরও কুড়ি নেব।”
চেক বার করে খসখস করে লিখে দিলেন চন্দ্রানী। রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে আসতে শুভ বলল, “এবারে কী করবে? খুঁজবে কীভাবে?”
ডিকে বলল, “এই নম্বরটা তো এয়ারটেলের নম্বর মনে হচ্ছে। তোর কাছে অরিন্দমের ফোন নম্বর আছে? আমি ট্রাই করছিলাম, লাগছিল না।”
শুভ বলল, “অরিন্দম মানে অরিন্দম রায়ের কথা বলছ, যে এয়ারটেল কাস্টমার কেয়ারে কাজ করে?”
ডিকে মাথা নাড়ল। শুভ বলল, “ও রিসেন্টলি নম্বর চেঞ্জ করেছে। দাঁড়াও, ওকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করে নতুন নম্বরটা দিতে বলছি।”
ডিকে বলল, “সঙ্গে রাজুর নম্বরটাও দিয়ে দে, জিজ্ঞেস কর এই নম্বরটা কোন নেটওয়ার্ক এরিয়াতে সুইচ অফ হয়েছে।”
“আচ্ছা,” শুভ মাথা নাড়ল।
গাড়িতে চেপে বাড়ি ফেরার পথে অরিন্দমের কাছ থেকে মেসেজের রিপ্লাই এল। শুভ বলল, “নম্বরটা সুইচ অফ হয়েছে নতুন বাজার এরিয়াতে।”
ডিকে অবাক হলো। বলল, “কেস গোলমাল লাগছে। এটা কোনো জেনারেল কেস নয়।”
শুভ বলল, “কেন? তোমার এরকম কেন মনে হচ্ছে?”
ডিকে বলল, “নতুন বাজার এরিয়াটা সেন্ট্রাল বাসস্ট্যান্ড কিংবা স্টেশনের সম্পূর্ণ অপজিট সাইডে। ও যদি এই শহর ছেড়ে কোথাও পালাতে চাইত, তাহলে ও শহরের ভেতরে যেত না, বাইরের দিকে যেত।”
শুভ বলল, “এমনও তো হতে পারে ও নতুন বাজার থেকে কাউকে রিসিভ করেছে, তারপর ফোন সুইচ অফ করে সেন্ট্রাল বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাস ধরে কোথাও চলে গিয়েছে।”
ডিকে বলল, “মানে লাভ কেস বলতে চাইছিস? তাহলে সিচুয়েশন গিয়ে দাঁড়াচ্ছে—জিগালোর কাজ করতে গিয়ে ওর কারুর সঙ্গে পরিচয় হয়, যার প্রেমে পড়ে, এবং নিজের ইমেজ ফ্রেশ রাখতে কাউকে কিছু না জানিয়ে তাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যায়, যেখানে ওকে কেউ চেনে না।”
শুভ মাথা নাড়ল। বলল, “অথবা নতুন বাজারে গিয়ে অন্য কোনো সংস্থার কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে ও যোগাযোগ করে এবং তার সঙ্গে ওদের শহরে চলে যায়।”
শুভর বাড়ির কাছে গাড়ি থামিয়ে ডিকে বলল, “প্রোব্যাবিলিটি তো অনেক কিছুই আছে, তার আগে আমাদের ওর লাস্ট কল ডিটেইলস চেক করতে হবে। অরিন্দমের নম্বরটা আমাকে দে, কাল সকালে আমি তোর বাড়িতে আসছি।”
“আচ্ছা,” বলে গাড়ি থেকে নামল শুভ। নিজের বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে ভাবল, আজ থেকে ‘জিগালো রহস্য’ শুরু হলো।
(৩)
পরদিন সকালে ফোন করে শুভকে বেরিয়ে আসতে বলল ডিকে। বাইরে এসে শুভ বলল, “নতুন কিছু জানতে পারলে?”
ডিকে বলল, “একটা ফোন নম্বর পেয়েছি, যেটা থেকে রাজুর নম্বরে লাস্ট কল এসেছিল। নম্বরটার টাওয়ার লোকেশন নতুন বাজার এরিয়া। কিন্তু ফেইক আইডি থেকে ফোন নম্বরটা তোলা। এই নম্বর থেকে আগেও রাজুর নম্বরে বেশ কয়েকবার কল এসেছে, সম্ভবত এটা ওর কোনো কাস্টমারের নম্বর। ফার্স্ট কল এসেছিল গত মাসের পনেরো তারিখ, সম্ভবত ওই সময়েই রাজুকে সে বুক করে। চল, চন্দ্রানীর কাছে গিয়ে ওই কাস্টমারের ব্যাপারে ডিটেইলস কিছু জানা যায় কি না দেখি।”
ডিকের গাড়িতে চেপে শুভ বলল, “চলো তবে। নম্বরটা কি খোলা আছে?”
ডিকে বলল, “না, যেদিন রাজুর নম্বর সুইচ অফ হয় এই নম্বরটাও সেদিনই সুইচ অফ হয়।”
শুভ বলল, “তার মানে তুমি কী বলতে চাইছ, এই কাস্টমারের সঙ্গেই রাজু ভেগেছে?”
ডিকে বলল, “সব কিছুই অনুমান নির্ভর। এর ব্যাপারে ডিটেইলস কিছু জানা না গেলে বোঝা যাবে না।”
ওরা চন্দ্রানীর কাছে পৌঁছাল। সব শুনে চন্দ্রানী বললেন, “কাস্টমারদের সেফটির জন্য ওদের আইডি আমরা রাখি না। আর এই মহিলা বুকিং করেছিলেন সোশ্যাল নেট সাইট থেকে, তাই ওনাকে আমরা চোখে দেখিনি।”
ডিকের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, “যে প্রোফাইল থেকে বুকিং হয়েছে সেই প্রোফাইলটা দেখান আমাকে।”
চন্দ্রানী প্রোফাইলটা দেখালেন। প্রোফাইল নেম ‘এঞ্জেল জেসমিন’। প্রোফাইলে একটা অর্ধনগ্ন বিদেশী মহিলার ছবি দেওয়া। ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, “এতেই কাজ হবে।”
সেদিন ফিরে শুভর রুমে গিয়ে ঢুকল ডিকে। শুভ বলল, “আচ্ছা, নতুন বাজারের নাম বারবার উঠে আসছে। আমার মনে হয় আমাদের একবার নতুন বাজারে গিয়ে ঢুঁ মারা দরকার। মনে হচ্ছে রাজু এখনো ওখানেই আছে।”
কম্পিউটার খুলে ডিকে বলল, “হাতে কিছু তথ্য না নিয়ে ওখানে গেলে সেটা অন্ধকারে ঢিল মারার মতো ব্যাপার হবে।”
শুভ বলল, “আচ্ছা, তবে দেখো কী বার করতে পারো।”
হাতছানি দিয়ে শুভকে কাছে ডাকল ডিকে। বলল, “এঞ্জেল জেসমিনের প্রোফাইলে কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমি লক্ষ্য করছি।”
কাছে এসে শুভ বলল, “কী ব্যাপার?”
জেসমিনের ফ্রেন্ডলিস্ট খুলে বসেছে ডিকে। একটা ফ্রেন্ডের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “এই লোকটাকে চিনিস?”
প্রোফাইল পিকটাতে শুভ দেখল একটা পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছরের বিদেশী লোক সি-বিচে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। হাতের ওপরে একটা স্পাইডারম্যানের ট্যাটু। লোকটার নাম লেখা আছে, কে. এন. ব্রায়ান।
শুভ বলল, “না, চিনি না। কে এই লোকটা?”
ডিকে বলল, “লোকটার নাম কেভিন নীল ব্রায়ান। ইনি অস্ট্রেলিয়ার একজন প্রাণী বিজ্ঞানী। বছর কয়েক আগে কিছু একটা গোপন ব্যাপার নিয়ে গবেষণা করতে করতে উনি নিখোঁজ হয়ে যান। অনেক খোঁজ করেও পুলিশ ওর সন্ধান পায়নি।”
“আচ্ছা,” শুভ মাথা নাড়ল। বলল, “তার সঙ্গে আমাদের কেসটার কী সম্পর্ক?”
ডিকে বলল, “হয়তো কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু সম্পর্ক থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়।”
শুভ হাসল। বলল, “কোথায় কেভিন নীল ব্রায়ান আর কোথায় রাজু গায়েন! আকাশ আর পাতালের সম্পর্ক।”
কয়েক সেকেন্ড খুটখাট করার পরে ডিকে বলল, “এই অ্যাকাউন্টটা যে কম্পিউটার থেকে লাস্ট টাইম অপারেট করা হয়েছে, সেটার আইপি অ্যাড্রেস আমি হ্যাক করে নিয়েছি। এটাও নতুন বাজার এরিয়া থেকে, কম্পিউটারের মালিকের নাম চন্দন দাস।”
শুভ বলল, “ঘুরেফিরে সেই একটা জায়গার নামই আসছে—নতুন বাজার। চলো যাওয়া যাক, ওখানে যদি কিছু পাওয়া যায়।”
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, “হ্যাঁ যাব। তুই রেডি হয়ে নে। আমরা এবারে চন্দন দাসের বাড়িতে হানা দেব।”
নতুন বাজারে এসে ওরা চন্দন দাসের নাম বলে খোঁজ করতেই এক ভদ্রলোক ওদের একটা ঠিকানা দেখিয়ে দিলেন। ওরা বাড়িটাতে এসে উপস্থিত হলো। বাড়ি নয়, এটা একটা সাইবার ক্যাফে। ওরা ক্যাফের ভেতরে ঢুকল।
ক্যাফেতে একটি আঠারো-উনিশ বছরের ছেলে বসেছিল। ওর কাছে গিয়ে ডিকে বলল, “আচ্ছা, চন্দন দাসের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?”
ছেলেটা বলল, “আমার নাম চন্দন দাস। কী ব্যাপার বলুন।”
ডিকে বলল, “আমরা গোয়েন্দা ডিপার্টমেন্ট থেকে আসছি। আমাদের কিছু ইনফরমেশন দরকার।”
গোয়েন্দা শুনে ছেলেটার মুখ শুকিয়ে গেছে। বলল, “কী ইনফরমেশন বলুন?”
ডিকে বলল, “গত মাসের তেরো তারিখ সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টার সময় একটি মেয়ে এখানে বসে খানিকক্ষণ নেট করেছিল, আমাদের ওই মেয়েটার ব্যাপারে ইনফরমেশন চাই।”
চন্দন বলল, “এখানে তো অনেকেই আসে, স্পেশাল কারোর ব্যাপারে ইনফরমেশন কীভাবে দেব? দু’একদিন আগের ঘটনা হলে তবুও কথা ছিল, এটা সতেরো-আঠারো দিন আগের কথা।”
ডিকে বলল, “কীভাবে দেবে তা আমরা জানি না, কিন্তু তোমাকে দিতে হবে। তোমার সেন্টারে বসে একটি মেয়ে বেআইনি কাজ করে যাবে, আর তুমি তার ব্যাপারে কোনো ইনফরমেশন রাখবে না, এরকম হলে আমরা তোমাকে অ্যারেস্ট করতে বাধ্য হব।”
চন্দন বলল, “দাঁড়ান, দাঁড়ান। আমার ক্যাফেতে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো আছে, আমি বার করে ফেলতে পারব।”
খানিকক্ষণের মধ্যেই সিসিটিভি থেকে সেদিনের ফুটেজ বার করে দিল চন্দন। ওরা দেখতে পেল ডান দিক থেকে তিন নম্বর কম্পিউটারে ক্যামেরার দিকে পেছন ফিরে বসে একটা মেয়ে নেট করছে। হঠাৎ কী একটা প্রয়োজনে মেয়েটা পেছন ফিরে ক্যামেরার দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে ছবিটা স্টপ করল ডিকে।
মেয়েটার মুখটা জুম করে বলল, “এই মুখটাকে এর আগেও আমি কোথাও যেন দেখেছি, ঠিক মনে করতে পারছি না।”
শুভ বলল, “কোনো ক্রিমিনাল নাকি?”
ডিকে বলল, “না, সম্ভবত কোনো ভিকটিম।” চন্দনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই মেয়েটাকে তুমি চেনো?”
চন্দন বলল, “না, তবে রবীন্দ্র অ্যাপার্টমেন্ট থেকে দু’একবার ওকে বেরিয়ে আসতে দেখেছি। মেয়েটা দেখতে সুন্দরী বলে চোখে লেগেছে।”
ডিকে মাথা নাড়ল। ছবিটার এক কপি প্রিন্ট আউট বার করে শুভকে নিয়ে নিজের বাড়িতে চলে গেল।
শুভ বলল, “আমরা খুব প্যাঁচালোভাবে তদন্ত করছি বলে আমার মনে হচ্ছে। যে কাজটা খুব সহজেই হয়ে যেত, সেটা নিয়ে খুব বেশি সময় নষ্ট করে ফেলছি।”
ডিকে বলল, “কী রকম?”
শুভ বলল, “আমাদের এক্ষুনি রবীন্দ্র অ্যাপার্টমেন্টে হানা দেওয়ার দরকার ছিল। আমার সন্দেহ রাজু এখনো ওখানেই আছে, আর যদি ওখান থেকে কোথাও পালিয়ে গিয়ে থাকে, খোঁজ করলে তার ঠিকানাটাও হয়তো পেয়ে যেতাম।”
ডিকে বলল, “ব্যাপারটা যদি এতটাই সহজ হতো তাহলে আমাদের টাকা দিয়ে ইনভাইট করার কোনো দরকার হতো না, চন্দ্রানীই ওকে খুঁজে বার করে ফেলতে পারত। সেটা পারেনি বলেই আমাদের ইনভাইট করেছে।”
শুভ বলল, “কীভাবে?”
ডিকে বলল, “চন্দ্রানী যতই বলুক ওদের কর্মীরা স্বাধীনভাবে কাজ করে; যাতে ওদের কর্মীরা ওদের সঙ্গে কোনো রকম প্রতারণা করতে না পারে, তাই কর্মীদের পেছনে ওরা ইনফর্মার লাগিয়ে রাখে। আমার অনুমান ইনফর্মাররা ইনফরমেশন দিতে ব্যর্থ হয়েছে, সেই কারণে আমাদের ইনভাইট করেছে চন্দ্রানী। এটা জেনারেল কেস নয়, ক্রাইম কেস হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ওরা পুলিশে জানাজানি করতে চায় না বলেই আমাদের ডেকেছে।”
শুভ বলল, “মাই গড! কিন্তু এ পর্যন্ত কেসের অগ্রগতি কতটা? আমরা তো সরেজমিনে কবে পৌঁছাব?”
ডিকে বলল, “স্টেপ বাই স্টেপ। ভিকটিমকে খুঁজে বার করার আগে নিজেকে সেফ রাখা জরুরি।”
শুভ বলল, “ততদিনে পাখি না উড়ে যায়।”
(৪)
আজ সকালে শুভর কাছে এল ডিকে। টেবিলে একটা গল্পের বই খুলে বসেছিল শুভ। ওর সামনে একটা পেপারের কাটিং নামিয়ে ডিকে বলল, “এই মেয়েটাকে চিনিস?”
কাটিংটা বছর তিনেক আগের হলেও ছবিটা চিনতে পারল শুভ। বলল, “এটা তো কম্পিউটার সেন্টারের মেয়েটা। এর ছবি পেপারে বেরিয়েছিল কেন?”
ডিকে বলল, “খবরটা পড়, তাহলেই বুঝতে পারবি।”
খবরটার আদ্যপান্ত পড়ে শুভ যা বুঝল তার সারমর্ম হচ্ছে এই—কেভিন নীল ব্রায়ান নামে এক জীববিজ্ঞানী কিছু একটা গোপন ব্যাপার নিয়ে রিসার্চ করছিলেন। ওর সহকারী হিসেবে ছিলেন তৃষ্ণা চক্রবর্তী নামে ভারতীয় একটি মেয়ে। ওদের রিসার্চ যখন প্রায় শেষের পথে, তখনই একদিন সন্ধ্যায় ওরা দুজনেই ল্যাব থেকে নিখোঁজ হয়ে যান। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। নাইট গার্ড দরজা দিয়ে কাউকে বেরোতে দেখেনি, মনে হচ্ছে ওরা যেন বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেছে। অনেক খুঁজেও পুলিশ ওদের কোনো সন্ধান করতে পারেনি। রুমের ভেতর থেকে ব্রায়ানের কিছু ইম্পর্ট্যান্ট রিসার্চ পেপার এবং একটা প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তি ছাড়া অন্য কিছু খোয়া যায়নি।
অবাক গলায় শুভ বলল, “তার মানে এই নিরুদ্দেশ দুটো পরস্পর লিঙ্কড?”
ডিকে বলল, “দুটো নয়, গত কয়েক বছরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বেশ কয়েকজন এভাবে অদৃশ্য হয়েছে, যার ম্যাক্সিমামের খবর পেপারে আসেনি।”
শুভর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল, “কিন্তু কী নিয়ে রিসার্চ করছিল কে. এন. ব্রায়ান? গোপন জিনিসটা কী?”
ডিকে বলল, “আমি এখনো জানি না। ওটা জানার জন্য আমার অস্ট্রেলিয়ান ডিটেকটিভ বন্ধুকে আমি খবর পাঠিয়েছি।”
“আচ্ছা,” মাথা নাড়ল শুভ। বলল, “এখন কী করবে?”
ডিকে বলল, “আজ থেকে সরেজমিনে তদন্ত শুরু করব। রেডি হয়ে নে, এখন আমাদের রবীন্দ্র অ্যাপার্টমেন্টে যেতে হবে।”
শুভ মাথা নাড়ল। খানিকক্ষণের মধ্যে ওরা রবীন্দ্র অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে গেল। অ্যাপার্টমেন্টের কাছে গিয়ে দারোয়ানকে তৃষ্ণার ছবি দেখিয়ে ডিকে জিজ্ঞেস করল, “ইনি কি এই অ্যাপার্টমেন্টেই থাকেন?”
দারোয়ান বলল, “হ্যাঁ, পাঁচতলার সাত নম্বর রুম। কিন্তু এখন তো উনি নেই, একটু বেরিয়েছেন।”
ডিকে বলল, “কখন ফিরবেন?”
দারোয়ান বলল, “কখন ফিরবেন তা তো বলতে পারব না। উনি প্রায়শই এরকম সময়ে বেরিয়ে যান, আসলে ওনার খুব কেনাকাটার শখ। এই তো সেদিন একটা বিশাল সাইজের প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তি কিনে আনলেন। তবে যখনই যান, বিকেলের মধ্যেই ফিরে আসেন। আপনারা কি ওর কেউ হন?”
ডিকে বলল, “হ্যাঁ, আমরা ওর পরিচিত।”
দারোয়ান বলল, “তাহলে ওকে ফোন করুন না।”
ডিকে বলল, “ফোন করেছিলাম, ওর নম্বর সুইচ অফ বলছে।”
দারোয়ান বলল, “তাহলে আর কী করবেন? একটু অপেক্ষা করুন।”
“আচ্ছা,” মাথা নাড়ল ডিকে। পকেট থেকে রাজুর ছবিটা বার করে বলল, “একে চেনো?”
দারোয়ান বলল, “হ্যাঁ দেখেছি, ইনি মাঝেমাঝে ম্যাডামের রুমে যান। সম্ভবত ওর বয়ফ্রেন্ড।”
ডিকে বলল, “লাস্ট কবে একে দেখেছ?”
দারোয়ান বলল, “সম্ভবত পাঁচদিন আগে। বিকেলের দিকে এসেছিলেন।”
ডিকে বলল, “কখন বেরিয়ে যান?”
দারোয়ান বলল, “তা তো বলতে পারব না। আমি ওকে বেরিয়ে যেতে দেখিনি। সম্ভবত রাতে বেরিয়েছিলেন। রাতের শিফটে যে লোকটা থাকে সে বলতে পারবে।”
ডিকে বলল, “উনি বেরিয়ে আসেননি। আজ পর্যন্ত ওই রুমেই আছেন। সম্ভবত রুমের ভেতরে ওকে খুন করা হয়েছে।”
দারোয়ান চমকে উঠল। বলল, “হায় রাম! আপনারা কি পুলিশের লোক?”
ডিকে বলল, “হ্যাঁ, আমরা পুলিশ থেকে আসছি। ওর রুমটা একবার সার্চ করতে চাই। ডুপ্লিকেট চাবি আছে তোমার কাছে?”
দারোয়ান বলল, “হ্যাঁ, আছে। আমার পেছনে পেছনে আসুন, আমি রুম খুলে দিচ্ছি। পনেরো মিনিটের মধ্যে যা সার্চ করার করে নিন।”
ডিকে মাথা নাড়ল। সামনের একটা পান দোকানির হাতে গেটের দায়িত্ব দিয়ে ওদের নিয়ে পাঁচতলায় চলে গেল দারোয়ান। রুম খুলে দিয়ে বলল, “আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি, আপনারা যা দেখার দেখে নিন।”
শুভকে নিয়ে রুমের ভেতরে ঢুকল ডিকে। শুভর গা ছমছম করতে লাগল। রুমটা বেশ সাজানো-গোছানো। অজস্র ছবি আর পোস্টার সাঁটা। আলনায় রকমারি ডিজাইনের পোশাক। রুমের মাঝে একটা বেড। সাদা রঙের নতুন একটা বেড কভার পাতা। তাছাড়া রুমের এক পাশে সার দিয়ে রাখা বেশ কয়েকটা প্লাস্টার অফ প্যারিসের তৈরি মূর্তি। দেখলে বোঝা যায় এই রুমের মালিক খুব শৌখিন। রুমের একপাশে কিচেন আর অন্যপাশে অ্যাটাচড বাথরুম।
শুভর দিকে তাকিয়ে ডিকে বলল, “খুব সাবধানে গোটা রুমটা সার্চ কর। কোথাও অস্বাভাবিক কিছু পেলে আমাকে জানাস।”
শুভ মাথা নাড়ল। খুঁজতে খুঁজতে মেঝের একপাশে খানিকটা সাদা চটচটে পদার্থ খুঁজে পেল শুভ। পাকামি করে বলল, “এখানে দেখ। পৌরুষ খুঁজে পেয়েছি।”
একটা কাঠি দিয়ে পদার্থটাকে তুলে একটা পলিথিনের ভেতরে ঢোকাতে ঢোকাতে ডিকে বলল, “তুই যেটা ভাবছিস এটা সেটা নয়। পাশের স্পটটা লক্ষ্য কর, তাহলেই বুঝতে পারবি। কোনো পুরুষের এত ভাণ্ডার নেই, কোনো হাতি কিংবা ঘোড়া হলে কথা ছিল।”
শুভ মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ, তা ঠিক।”
কথা বলতে বলতে ওরা বাথরুমের ভেতরে এসে ঢুকল। বাথরুমের এক কোণা থেকে একটা বেলুনের মতো কিছু তুলে নিল ডিকে।
শুভ বলল, “ওটা কী?”
ডিকে বলল, “কন্ডোম। এর ভেতরে এখনো রক্তের দাগ লেগে আছে। কী বুঝছিস?”
শুভ বলল, “এর মানে তৃষ্ণা ভার্জিন কিংবা ঋতুমতী ছিল?”
ডিকে বলল, “তোর মাথা! চল বেরিয়ে পড়া যাক।”
ওরা অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে এল। দারোয়ানের দিকে তাকিয়ে ডিকে বলল, “আমাদের এই সার্চিং-এর খবর তোমাদের ম্যাডাম যেন কোনোভাবেই জানতে না পারে, তাহলে কিন্তু তুমি অ্যারেস্ট হবে।”
দারোয়ান বলল, “আমি কিছু জানি না স্যার। আমি কাউকে কিছু বলব না।”
“আচ্ছা,” ডিকে মাথা নাড়ল।
বাড়িতে ফেরার পথে শুভ বলল, “আমার মনে হয় আমরা ভুল জায়গায় খুঁজছি। রাজু অলরেডি অন্য কোথাও চলে গেছে।”
ডিকে বলল, “না, আমরা ঠিক জায়গাতেই খুঁজছি। রাজু ওই ফ্ল্যাটেই আছে।”
অবাকভাবে ডিকের দিকে তাকাল শুভ। বলল, “আমাদের কি মাথা খারাপ হয়েছে? যেভাবে তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে, তাতে এত বড় একটা মানুষের খোঁজ পাওয়া যেত না? এটা কোনো ইঁদুর-ছুঁচো নয় যে গর্তের ভেতরে লুকিয়ে থাকবে।”
হা হা করে হেসে ডিকে বলল, “খোঁজার চোখ থাকলে অনেক কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়।”
অবশ্যই। নিচে গল্পের দ্বিতীয় পর্ব (ল্যাব রিপোর্ট থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত) দেওয়া হলো। এখানে আপনার নির্দেশমতো নতুন ক্লাইম্যাক্স এবং মশা মারার মেশিন ব্যবহারের দৃশ্যটি গল্পের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে বানান ও যতিচিহ্ন সংশোধন করা হয়েছে।
গল্প: জিগালো রহস্য (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)
(৫)
আজ সকাল থেকে শুভর মন খচখচ করছিল। কাল ডিকের সঙ্গে ওরা ল্যাবরেটরিতে গিয়েছিল। তৃষ্ণার বাড়ি থেকে পাওয়া জিনিসগুলো ল্যাবে জমা দিয়েছে, আজ সকালে রিপোর্ট দেওয়ার কথা। কী রিপোর্ট হলো কে জানে? আর থাকতে না পেরে ডিকে-কে ফোন করল শুভ।
ডিকে ফোন ধরতেই শুভ জিজ্ঞেস করল, “কোথায় আছো?”
ডিকে বলল, “এই তো ল্যাব থেকে বেরোচ্ছি।”
শুভ বলল, “ল্যাবরেটরির রিপোর্ট পাওয়া গেল?”
ডিকে বলল, “হ্যাঁ, পাওয়া গেছে।”
শুভ বলল, “ওই সাদা পদার্থটা কী, সেটা জানা গেছে?”
ডিকে বলল, “ওটা এক ধরনের এনজাইম, যা নিম্নশ্রেণীর কীটপতঙ্গদের শরীরে পাওয়া যায়। খাবার পাচিত করার জন্য ওরা এই এনজাইম ব্যবহার করে।”
শুভ বলল, “মাই গড! কতগুলো কীট তাদের শরীর থেকে এনজাইম নির্গত করলে এতটা পরিমাণে এনজাইম হয়?”
ডিকে বলল, “পুরো এনজাইমটা একটাই মাত্র প্রাণীর। প্রাগৈতিহাসিক যুগে কীটপতঙ্গরা এত ছোট ছিল না। আজ থেকে সাড়ে উনিশ কোটি বছর আগে ডাইনোসর যুগে একটা কীট যে আকারের হতো, এই প্রাণীটাও ঠিক ততটাই বড়।”
শুভ বলল, “কত বড়?”
ডিকে বলল, “সেই কীটটার ওজন মিনিমাম ষাট কেজি।”
শুভ চমকে উঠল। বলল, “আর কন্ডোমে লেগে থাকা রক্ত? ওটা কার?”
ডিকে বলল, “নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে রাজুর যে ব্লাড গ্রুপ, এটাও ওই একই গ্রুপের রক্ত।”
শুভ বলল, “তার মানে তুমি বলতে চাইছ, ষাট কেজি ওজনের একটা কীটকে নিজের বাড়িতে পুষে রেখেছে তৃষ্ণা? এই লোকগুলোর অদৃশ্য হবার কারণ ওই কীট?”
ডিকে বলল, “অনেকটা ওরকমই।”
শুভ বলল, “এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, কেভিন নীল ব্রায়ান কোনো প্রাগৈতিহাসিক কীট খুঁজে পেয়েছিলেন। কিংবা সাধারণ কোনো কীটকে প্রাগৈতিহাসিক কীটের মতো বড় আকারের করতে চেয়েছিলেন। হয়তো তারপরই ওনার মনে হয় এটা প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করবে, তাই উনি কীটটাকে মেরে ফেলতে চান। কিন্তু তৃষ্ণা ওকে সেই কাজে বাধা দেয়; সে ওই কীটটাকে দিয়ে কেভিনকে মেরে ফেলে এবং কীটের খাদ্য বানায়, যে কারণে কেভিনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।”
ডিকে বলল, “তোর বুদ্ধি খুলছে দেখছি আজকাল। আমার সঙ্গে থাকলে পাকা গোয়েন্দা হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগবে না।”
শুভ বলল, “তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু যদি তাই হবে, তাহলে কীটটাকে আমরা খুঁজে পেলাম না কেন? ষাট কেজি ওজনের একটা কীট নিশ্চয়ই খুব ছোট হবে না। তাছাড়া এত বড় একটা কীট যদি কোনো মানুষকে খেয়েও ফেলে, তাহলেও তার হাড়গোড় হজম করতে পারবে না, সেগুলো কোথায় যাবে?”
ডিকে বলল, “সময় আসুক, সব দেখতে পাবি।”
(৬)
গত দুদিন ডিকের কোনো কন্টাক্ট নেই। ওকে ফোনেও পাচ্ছিল না শুভ। আজ সকালে ডিকে শুভর রুমে এসেু ঢুকল। শুভর দিকে তাকিয়ে বলল, “তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে, আমাদের এক্ষুনি বেরোতে হবে।”
শুভ জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাবে?”
ডিকে বলল, ”প্রথমে কর্পোরেশনের অফিসে, তারপর রবীন্দ্র অ্যাপার্টমেন্টে।”
শুভ বলল, “রহস্যের কতদূর?”
ডিকে বলল, “রহস্য সমাধান হয়ে গেছে, এখন স্রেফ অপরাধীর মুখোমুখি হওয়ার পালা।”
শুভ বলল, “রাজুকে খুঁজে পাওয়া গেছে?”
ডিকে বলল, “না, রাজু বেঁচে নেই বলেই আমার বিশ্বাস। ও ওই দানবাকৃতি কীটের খাদ্য হয়ে গিয়েছে।”
কর্পোরেশন অফিসে গিয়ে ডিকে মশা মারার ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে কীসব কথা বলে এল। কিছুক্ষণ পর দুজন নীল ইউনিফর্ম পরা কর্মী বেরিয়ে এল, তাদের পিঠে বিশাল আকারের দুটি ফগিং মেশিন এবং স্প্রে করার ট্যাঙ্ক।
শুভ বলল, “এরা আমাদের সঙ্গে যাবে?”
ডিকে হাসল। ইয়ার্কি করে বলল, “রবীন্দ্র অ্যাপার্টমেন্টে খুব মশার উৎপাত হচ্ছে, তাই এদের নিয়ে যাচ্ছি।”
শুভ বলল, “ও আচ্ছা বুঝেছি। কারও যাতে কোনো সন্দেহ না হয় তাই এদের নিয়ে যাচ্ছ? কর্পোরেশনের লোক পরিচয় দিয়ে ভিতরে ঢুকবে? কিন্তু এত বড় বড় মেশিন নেওয়ার কি দরকার ছিল?”
ডিকে বলল, “প্রাগৈতিহাসিক যুগের মশা তো, সাধারণ স্প্রে-তে মারা যাবে না, তাই হেভি মেশিনারিজ দরকার।”
কথা বলতে বলতে ওরা রবীন্দ্র অ্যাপার্টমেন্টে এসে পৌঁছাল। ভেতরে গাড়ি ঢুকিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল ডিকে। ওর পেছন পেছন নামল শুভ এবং সেই দুই কর্পোরেশনের কর্মী।
ডিকে দেখতে পেল একটা টুল নিয়ে দারোয়ান বসে আছে, আর ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরও একটা লোক। সাত ফুটের মতো লম্বা লোকটা। চেহারায় একটা সৈনিক-সৈনিক ভাব আছে।
শুভকে নিয়ে লোকটার কাছে গেল ডিকে। শুভর দিকে তাকিয়ে বলল, “ইনি হচ্ছেন এখানের লোকাল থানার ওসি, মিস্টার এ. ভার্গব। আর এ হচ্ছে আমার ভাই কাম সহকারী শুভজিৎ বোস।”
ভার্গব মাথা নাড়লেন। বললেন, “তোমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব খুশি হলাম।”
দারোয়ানের দিকে তাকিয়ে ডিকে বলল, “তোমাদের ম্যাডাম এখনো রুমে আছেন?”
দারোয়ান মাথা নাড়ল। বলল, “হ্যাঁ স্যার। আজ উনি রুম থেকে বেরোননি।”
ভার্গবকে নিয়ে পাঁচতলায় উঠে এল ডিকে। পেছনে মেশিন কাঁধে দুই কর্মী।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ভার্গব বললেন, “ইন্টারপোল থেকে কাল রাতেই ফোন এসেছিল। বলেছে জন্তুটাকে দেখতে পেলেই মেরে ফেলতে। কিন্তু এত বড় একটা জন্তু নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে একজন ইন্ডিয়াতে নিয়ে এল অথচ কেউ দেখতে পেল না, এটা ভাবতেই তো আমার অবাক লাগছে।”
ডিকে বলল, “যদি ভালো করে লক্ষ্য না করেন আপনিও দেখতে পাবেন না জন্তুটাকে। খুব সাবধানে থাকবেন, যেকোনো সময় জন্তুটা আক্রমণ করতে পারে।”
(৭)
সাত নম্বর রুমে গিয়ে বেল টিপতেই একটা মেয়ে এসে দরজা খুলে দিল। দরজার সামনে পুলিশ এবং মেশিন কাঁধে অদ্ভুত দর্শন লোক দেখে সে অবাক হলো।
বলল, “আপনারা?”
এতক্ষণে মেয়েটাকে সামনাসামনি দেখল শুভ। মেয়েটার চেহারা একটু মোটার দিকে। গায়ের রঙ ফর্সা। দেখতে বেশ সুশ্রী।
তৃষ্ণা কিছু বলার আগেই ডিকে বলল, “ম্যাডাম, আমরা মিউনিসিপালিটি থেকে আসছি। এই বিল্ডিংয়ে ডেঙ্গু খুব বেড়েছে, তাই প্রত্যেকটা ফ্ল্যাটে স্প্রে করা ম্যান্ডেটরি। এটা সরকারি অর্ডার।”
তৃষ্ণা একটু ইতস্তত করে বলল, “কিন্তু আমার ফ্ল্যাটে তো মশা নেই।”
ডিকে বলল, “সেটা আমরা চেক করে দেখব। আপনি সরে দাঁড়ান।”
তৃষ্ণাকে একপ্রকার ঠেলে রুমের ভেতরে ঢুকে পড়ল ডিকে, সঙ্গে বাকিরা। দরজা বন্ধ করে ডিকে সোফায় বসল।
তৃষ্ণা বলল, “আপনারা স্প্রে না করে সোফায় বসছেন কেন?”
ডিকে হাসল। বলল, “স্প্রে তো হবেই, তার আগে আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে। আমি যদি ভুল না করে থাকি, আপনার নাম তৃষ্ণা চক্রবর্তী। আপনি অস্ট্রেলিয়ান জীববিজ্ঞানী কেভিন নীল ব্রায়ানের সহকারী ছিলেন।”
মেয়েটা চমকে উঠল। পরমুহূর্তেই সামলে নিয়ে বলল, “মোটেই না, আমার নাম ইন্দ্রাণী রায় আর আমি জীবনে কখনো অস্ট্রেলিয়া যাইনি।”
পকেট থেকে পেপারের কাটিংটা বার করল ডিকে। তৃষ্ণার ছবিটা দেখিয়ে বলল, “এই ছবিটা যে আপনার, সেটা নিশ্চয়ই অস্বীকার করতে পারেন না।”
অবাক হওয়ার ভান করে মেয়েটা বলল, “একটা মেয়ে আমার মতো দেখতে বলেই আপনি তাকে আমি ভেবে নিলেন?”
ডিকে বলল, “আমরা যথেষ্ট খোঁজখবর নিয়েই আসছি ম্যাডাম। আপনি নিজেকে যতই লুকোবার চেষ্টা করুন, পারবেন না। আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ‘এঞ্জেল জেসমিন’ আমরা হ্যাক করেছিলাম, সেখানে কে. এন. ব্রায়ানের সঙ্গে আমরা আপনার কথোপকথন পেয়েছি। তাছাড়া এখানে এসে যে কম্পিউটার থেকে আপনি অ্যাকাউন্টটা ওপেন করেছিলেন সেটার আইপি অ্যাড্রেস আমরা হ্যাক করেছি। ওখানের সিসিটিভি ক্যামেরায় আপনার ছবি দেখা গেছে। লুকোবার চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই।”
তৃষ্ণা বলল, “যদি আমি তৃষ্ণাই হয়ে থাকি, আমার অপরাধটা কী?”
ডিকে বলল, “কেভিন কিছু একটা গোপন ব্যাপার নিয়ে রিসার্চ করছিলেন, যেটাতে উনি সফল হন। তারপর আপনি তাকে খুন করে ওর রিসার্চ পেপার নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে চলে যান। ঠিক বলছি কি?”
তৃষ্ণা বলল, “কী উল্টোপাল্টা কথা বলছেন?”
ডিকে বলল, “শুধু কে. এন. ব্রায়ান নয়; আফ্রিকা, তানজানিয়া, মিশর এমনকি ইন্ডিয়া—যে দেশেই আপনি গেছেন সেখানেই একজন করে মানুষকে খুন করেছেন।”
তৃষ্ণার চোখ লাল হয়ে গেল। বলল, “কিন্তু আমি কেন খুন করতে যাব? খুনের পেছনে তো একটা মোটিভ থাকে? খামোখা মানুষ খুন করে নিজের বিপদ বাড়িয়ে আমার লাভ কী?”
ডিকে কিছু বলার আগেই শুভ বলল, “আপনি বাড়িতে একটা দানবাকৃতি কীট পুষে রেখেছেন, যাকে খাবার দেওয়ার জন্য আপনি ওই লোকগুলোকে খুন করেছেন।”
তৃষ্ণা বলল, “আপনারা পাগল হয়েছেন। আমার বাড়িতে আমি একখানা দানবাকৃতি কীট পুষেছি আর কেউ সেটাকে দেখতে পায়নি, এটাও সম্ভব?”
ভার্গব বললেন, “কে বলল দেখতে পায়নি? আপনার উল্টোদিকের অ্যাপার্টমেন্টের এক ভদ্রলোক ওই দিন আমাদের ফোন করে জানিয়েছিলেন, জানলা দিয়ে উনি এক বিশাল সাইজের মাকড়সার মতো জিনিসকে আপনার রুমের ভেতরে ঘুরে বেড়াতে দেখেছিলেন। কিন্তু আমরা ব্যাপারটাকে গ্রাহ্য করিনি। কাল রাতে ইন্টারপোল থেকে ফোন এসেছে ওই জন্তুটা এখানেই আছে, ওকে দেখতে পেলেই যেন মেরে ফেলা হয়।”
হো হো করে হেসে উঠল তৃষ্ণা। ভার্গবের দিকে তাকিয়ে বলল, “রূপকথার গল্প শুনিয়ে এভাবে হাসির খোরাক হবেন না মিস্টার অফিসার। আপনারা সার্চ করে দেখতে পারেন, আমার বাড়িতে সত্যিই এরকম জন্তু আছে কি না।”
শুভ আর ভার্গব প্রবল উদ্যমে রুমটা সার্চ করতে আরম্ভ করল। খানিকক্ষণ সার্চ করার পরে হতাশভাবে ফিরে এসে ভার্গব বললেন, “না, রুমে কিন্তু কোনো জন্তুই নেই।”
শুভ বলল, “কোনো গোপন দরজাও নেই, যার ভেতরে জন্তুটাকে লুকিয়ে রাখা যায়। আর বাথরুমের জানলাটাও এতটা বড় নয় যে ষাট কেজি ওজনের একটা কীট ওটা দিয়ে গলে বেরিয়ে যেতে পারে।”
তৃষ্ণা বলল, “আমার কাছে এমন কিছু নেই, আপনারা ভুল জায়গায় এসেছেন।”
ভার্গবের দিকে তাকিয়ে ডিকে বলল, “এবারে আমি কিছু বলি?”
ভার্গব বললেন, “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।”
ডিকে বলল, “আমি আপনাদের আগেই বলেছিলাম, ভালো করে না দেখলে জন্তুটাকে আপনারা খুঁজে পাবেন না। ওই কারণে জন্তুটা এতক্ষণ আমাদের সামনেই বসে আছে, অথচ আপনারা দেখতে পাননি।”
চমকে উঠে ওরা তৃষ্ণার দিকে তাকাল।
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে শুভ বলল, “মানে?”
তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে ডিকে বলল, “আপনি আমার কাছে খুনের মোটিভ জানতে চাইছিলেন না? এবারে মোটিভটা বলি। আপনি ওদের খুন করেছেন, কারণ আপনার সহজাত ইন্সটিঙ্কট (Instinct) বলে পুরুষদের সঙ্গে যৌনসঙ্গম করলে তাদের খুন করে খেয়ে ফেলতে হয়। আর আপনি যাদের খুন করেছেন, তাদের সকলেই আপনার সঙ্গে যৌনসঙ্গম করেছিল।”
তৃষ্ণা রেগে গেল। বলল, “মানুষের ধৈর্যের একটা সীমা থাকে। আপনি তখন থেকে উল্টোপাল্টা অভিযোগ করে যাচ্ছেন! কোনো প্রমাণ আছে আপনার কাছে?”
ডিকে বলল, “প্রমাণ তো আছেই।” বলে কাছে থাকা প্লাস্টার অফ প্যারিসের তৈরি একটা মূর্তি তুলে মেঝের ওপর আছড়ে ফেলল। মূর্তিটা ভেঙে গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে যেতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা আস্ত নরকঙ্কাল।
কিছু না জানার ভান করে তৃষ্ণা বলল, “এটা কীভাবে এখানে এল? আমি তো কিছুই জানি না।”
ডিকে বলল, “আর ভান করবেন না ম্যাডাম। অস্ট্রেলিয়ার এক বন্ধুর কাছ থেকে ব্রায়ানের রিসার্চের ব্যাপারে সব কিছুই জানতে পেরেছি। আপনি আত্মসমর্পণ করুন, আমরা আপনাকে চিড়িয়াখানায় বন্দি করে রাখব।”
(৮)
ফোঁস করে উঠে দাঁড়াল তৃষ্ণা। বলল, “বেশ করেছি, খুন করেছি। আমি অভুক্ত ছিলাম, ওরা আমার ক্ষুধা মিটিয়েছে। এবারে আপনারা আমার ক্ষুধা মেটাবেন। আজ আপনাদেরও মেরে ফেলব। তাহলে কোনো প্রমাণ থাকবে না।”
ভার্গবের হাতে একটা পিস্তল উঠে এসেছে। বলল, “এই ভুলটা করার চেষ্টা করবেন না। তাহলে আপনি এখানেই শেষ হয়ে যাবেন।”
হো হো করে হেসে উঠল তৃষ্ণা, তারপর দু’লাফে দেওয়াল বেয়ে সরসর করে সিলিং-এ চড়ে গেল। বুকটা ধক করে উঠল শুভর।
দেখতে দেখতে তৃষ্ণার শরীর, মুখ, হাত, পা সব বদলে যেতে লাগল। ওর গায়ের পোশাকটা ধীরে ধীরে ছিঁড়তে আরম্ভ করেছে। পেটের ভেতর থেকে কাতারে কাতারে ঠ্যাং বেরিয়ে আসছে। পাশে তাকিয়ে শুভ দেখল, বিস্ফারিত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন ভার্গব। খানিকক্ষণের মধ্যেই তৃষ্ণার শরীরটা এক বিশাল সাইজের মাকড়সাতে রূপান্তরিত হলো। মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল কালো কুচকুচে একখানা জিভ।
আতঙ্কিত গলায় ভার্গব বললেন, “এ কী…?”
মাকড়সাটা চলতে আরম্ভ করেছে। ওকে লক্ষ্য করে একটা গুলি চালালেন ভার্গব। সেকেন্ডের মধ্যে নিজেকে সরিয়ে সে বাঁচিয়ে নিল, তারপর ছাদের ওপর দিয়ে সরসর করে ছুটে এসে ওপর থেকে দুটো ঠ্যাং দিয়ে জড়িয়ে ভার্গবকে ওপরে তুলে নিল। পশ্চাৎদেশ থেকে একটা দড়ির মতো মোটা জাল বার করে ভার্গবের গলায় প্যাঁচ দিতে শুরু করল।
ক্যাক ক্যাক করে ভার্গব বললেন, “কিছু করুন…!”
শুভ ঝাঁপিয়ে উঠে ভার্গবকে ধরার চেষ্টা করল, পারল না। মাকড়সাটা ভার্গবকে জালে জড়িয়ে নিয়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করল। এত বড় একটা মানুষকে তুলে নিয়ে যে প্রাণীটা দেওয়াল বেয়ে হাঁটতে পারে, তার শক্তি কত হবে সেটা আন্দাজ করেই শুভর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
সে ডিকে-কে ধাক্কা মেরে বলল, “তুমি কিছু করো!”
ডিকে পেছনের কর্পোরেশনের সেই লোক দুটোর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, “পাম্প চালু করো! ফুল ফোর্সে…!”
বিশাল সাইজের দুখানা মেশিনের নজল (Nozzle) মাকড়সাটার দিকে তাক করল লোক দুটো। পরমুহূর্তেই তীব্র হিস হিস শব্দে মেশিন থেকে সাদা ঘন ধোঁয়া এবং তরল কেমিক্যাল বেরিয়ে এসে মাকড়সাটাকে ঢেকে ফেলল।
ভার্গবের দিকে তাকিয়ে ডিকে চিৎকার করল, “একটুক্ষণ দম আটকে রাখুন অফিসার! এই ট্যাঙ্কে আমি সাধারণ মশার ওষুধের বদলে হাই-কনসেন্ট্রেটেড কীটনাশক আর ওই এনজাইম নষ্ট করার কেমিক্যাল মিশিয়ে এনেছি। ও বাঁচবে না!”
মেশিনের আওয়াজ আর কেমিক্যালের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে ঘর ভরে গেল। মাকড়সাটা যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বেশ খানিকক্ষণ স্প্রে করার পরে মাকড়সাটার শরীর শিথিল হয়ে এল। ভার্গবকে ধপ করে সে নিচে আছড়ে ফেলল, তারপর নিজেও এসে ভার্গবের পাশে আছড়ে পড়ল।
(৯)
খানিকক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পরে ভার্গবের কাছে গিয়ে ওর গলায় পেঁচিয়ে থাকা জালটাকে টেনে খুলে ফেলল শুভ। মাকড়সাটার দিকে তাকিয়ে দেখল সেটা আবার মানুষে পরিণত হচ্ছে। খানিকক্ষণের মধ্যেই মেঝের ওপরে নগ্ন অবস্থায় তৃষ্ণাকে পড়ে থাকতে দেখল।
ওর বুকের ওপরে চড়ে বসল ডিকে। এক হাতে স্প্রে মেশিনের পাইপটা ধরে আছে সে। ওর দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় তৃষ্ণা বলল, “আমাকে মারবেন না প্লিজ, তাহলে বিজ্ঞানের একটা বিশাল আবিষ্কার নষ্ট হয়ে যাবে।”
ডিকে ঠান্ডা গলায় বলল, “যে আবিষ্কার আবিষ্কারককেই খুন করে ফেলে, সেই ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের’ বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।”
এই বলে স্প্রে-র নজলটা তৃষ্ণার মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে মেশিনটা চালিয়ে দিল ডিকে।
(১০)
আজ শুভর বাড়িতে সবাই এসে জুটেছে। ডিকে আর শুভ তো আছেই, সঙ্গে রয়েছে চন্দ্রানী আর ভার্গব। ভার্গবের গলায় বেশ চোট লেগেছিল, এখন মোটামুটি সুস্থ। কয়েকটা দিন বেশ ট্রমা-য় ভুগেছিল শুভ, এখন মোটামুটি ট্রমা কাটিয়ে উঠেছে।
ডিকের দিকে তাকিয়ে শুভ বলল, “ব্যাপারটা কী, আমাদের একটু খুলে বলো? একটা জলজ্যান্ত মানুষ কীভাবে মাকড়সা হয়ে গেল, কিছুই তো বুঝতে পারলাম না।”
ডিকে বলল, “কেভিন নীল ব্রায়ান ছিলেন একজন প্রাণীবিজ্ঞানী। ছোট থেকেই ওনার শখ ছিল উনি মানুষের জিনে পরিবর্তন ঘটিয়ে মানুষকে বিভিন্ন প্রাণীতে রূপান্তরিত করবেন। ‘স্পাইডারম্যান’-এর ভক্ত হওয়ার দরুন ওর একটা স্পাইডারম্যান তৈরির শখ জাগে। তারপর ওর সহকারী তৃষ্ণার জিনে উনি পরিবর্তন ঘটাতে শুরু করেন। অনেক প্রজাতির মাকড়সা উনি সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু একটি বিশেষ প্রজাতির মাকড়সার জিন মানুষের জিনের সঙ্গে ম্যাচ করে আর উনি এই কাজে সফল হয়ে যান।”
ডিকে কফিতে চুমুক দিয়ে আবার বলল, “কিন্তু উনি ভাবতে পারেননি জিনগত পরিবর্তন ঘটালে অনেক সময় সহজাত ইন্সটিঙ্কটের পরিবর্তন ঘটে যায়। তাই সফল হবার পরে সহজ বিশ্বাসেই তৃষ্ণার সঙ্গে মিলিত হন। সম্ভবত এই ঘটনায় তৃষ্ণা ওকে উত্তেজিত করেছিল বলেই আমার বিশ্বাস, যে কারণে উনি খুন হয়ে যান।”
শুভ বলল, “কিন্তু মিলনের পরে খুন ব্যাপারটা আমার ঠিক মাথায় ঢুকছে না।”
ডিকে বলল, “উত্তর আমেরিকার ‘ব্ল্যাক উইডো’ (Black Widow) মাকড়সার ব্যাপারে শুনেছিস কি?”
শুভ বলল, “হ্যাঁ, এরা মিলনের পরে এদের পার্টনারকে মেরে খেয়ে ফেলে। এটা ক্যানিবালিজমের একটা ভালো উদাহরণ।”
ডিকে বলল, “আমার অনুমান, তৃষ্ণার শরীরে যে মাকড়সাটার জিন ম্যাচিং করেছিল তা একটা ব্ল্যাক উইডো মাকড়সার। এই কারণে তৃষ্ণা মিলনের পরে লোকগুলোকে শুধু খুনই করেনি, তাদের শরীরে যেটুকু মাংস এবং জলীয় অংশ সেটুকুকেও খেয়ে ফেলেছে। হাড়গুলোকে প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তি কিনে তার ভেতরে পুরে ফেলেছে। এর ফলে মানুষগুলো খুন হবার পরেও ওদের হাড়গোড়গুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি।”
শুভ বলল, “কিন্তু তুমি কীভাবে বুঝলে হাড়গোড়গুলো ওই মূর্তির ভেতরেই ঢোকানো আছে?”
ডিকে বলল, “তুই বোধহয় কেভিন নীল ব্রায়ানের নিরুদ্দেশ হবার খবরটা মন দিয়ে পড়িসনি। ওখানে লেখা ছিল দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল, কেভিনের বাড়ি থেকে কিছুই খোয়া যায়নি, কেবল ওর কিছু ইম্পর্ট্যান্ট রিসার্চ পেপার আর একটা প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তি ছাড়া।”
“তখনই আমার মনে হয় রিসার্চ পেপার চুরি করার অনেক কারণ থাকতে পারে, কিন্তু প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তি কেউ কেন বাড়ি থেকে নিয়ে যাবে? মূর্তির ভেতরে খানিকটা ফাঁকা জায়গা থাকে। একটা জলজ্যান্ত মানুষকে ওই মূর্তির ভেতরে করে নিয়ে যাওয়া যাবে না, কিন্তু যদি মানুষটার ছাল-মাংস ছাড়িয়ে কেবল হাড়গোড়গুলোকে ওই মূর্তির ভেতরে ঢোকানো যায়, তাহলে সেটা কিন্তু অনায়াসেই পাচার করা সম্ভব।”
“হ্যাঁ, তা ঠিক,” শুভ মাথা নাড়ল।
ডিকে বলল, “তৃষ্ণার রুমে ঢুকে যখন আমরা রাজুকে খুঁজে পেলাম না, কিন্তু বেশ কয়েকখানা প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তি দেখতে পেলাম, তখনই ব্যাপারটা আমার কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল।”
চন্দ্রানীর চোখে একটা বিষণ্ণতার ছাপ। বললেন, “শেষ পর্যন্ত রাজুর খোঁজ পাওয়া গেল?”
ভার্গব বললেন, “হ্যাঁ, ডিএনএ পরীক্ষায় জানা গেছে, ডিকে যে স্কাল্পচারটা ভেঙে কঙ্কালটা বার করেছিল, ওটাই রাজুর কঙ্কাল। বাকি কঙ্কালগুলোর সবার আইডি জানা যায়নি, তবে একটা কঙ্কাল কে. এন. ব্রায়ানের হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ইন্টারপোলকে খবর পাঠিয়েছি, ওরা এসে বাকিগুলো নিয়ে যাবে।”
চন্দ্রানী মাথা নাড়লেন। ডিকের হাতে একটা চেক দিয়ে বললেন, “আপনার টাকা।”
চেকটা নিয়ে ডিকে বলল, “ধন্যবাদ।”
ভার্গব বললেন, “এই ঘটনার পেছনে আপনি কাকে দায়ী করতে চান? যে বিজ্ঞানী জন্তুটাকে বানিয়েছিল, নাকি যে খুনগুলো করছিল?”
ডিকে বলল, “বিজ্ঞানী আবিষ্কারের নেশায় আবিষ্কার করেছেন, উনি মোটেই কোনো খারাপ চিন্তা নিয়ে জিনিসটা আবিষ্কার করেননি। নোবেল ডিনামাইট আবিষ্কার করেছিলেন সমাজের ভালোর জন্য, উনি কখনোই ভাবেননি যুদ্ধে এটাকে মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে। তাই বিজ্ঞানীকে পুরোপুরি দায়ী করা ঠিক হবে না। আর তৃষ্ণা তার সহজাত প্রবৃত্তি থেকে খুন করেছে, কখনো আত্মরক্ষার তাগিদে আক্রমণ করেছে। কিন্তু ও চাইলে আরও অনেক খুন করতে পারত, যাদের নাগাল আমরা কখনোই পেতাম না। তাই ওকেও পুরোপুরি দানব বলা যায় না।”
একটু থেমে ডিকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “এটাকে একটা ভয়াবহ এক্সিডেন্ট হিসেবে ধরে নেওয়াই ভালো।”
(সমাপ্ত)