(এক)
“ডাক্তারবাবু, আমি কি আবার আগের মতো হাঁটতে পারব?” অ্যানেস্থেশিয়ার প্রভাবে ঘুমে ঢলে পড়ার ঠিক আগে প্রশ্নটা করল তমোঘ্ন।
ডাক্তারবাবু মৃদু হেসে আশ্বাস দিলেন, “চিন্তার কোনো কারণই নেই। এখন অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা অঙ্গ প্রতিস্থাপন অনেক আধুনিক হয়েছে। একবার ফিট হয়ে গেলে আপনি আবার আগের মতোই চলাফেরা করতে পারবেন।”
নিশ্চিন্ত হয়ে চোখ বুজল তমোঘ্ন। মনে মনে ভাবল—সত্যিই কি এ সম্ভব?
বছর পাঁচেক আগেই দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল। গাড়ি চালিয়ে অফিস থেকে ফিরছিল তমোঘ্ন, হঠাৎ একটা বেপরোয়া ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ। ট্রাকটা ওর গাড়ির ওপর এমনভাবে চেপে গিয়েছিল যে শরীরের অর্ধেকটা চলে গিয়েছিল স্টিয়ারিংয়ের তলায়। শেষপর্যন্ত হাঁটুর নিচ থেকে পা দুটো কেটে তাকে বার করে আনতে হয়।
সেই থেকে তমোঘ্ন পঙ্গু। জীবনটা হুইল চেয়ারেই বন্দী হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে নিজেকে খুব হতাশ আর অসহায় লাগত। প্রতি মুহূর্তে এই পঙ্গুত্ব থেকে মুক্তি চাইত সে, এর জন্য যেকোনো মূল্য দিতেও প্রস্তুত ছিল। ঠিক তখনই ডঃ বিনোদ সরকারের নামটা ওর কানে আসে। শোনা যায়, এই সার্জন নাকি অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে বহু পঙ্গু মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
এক বন্ধুর মাধ্যমে যোগাযোগ করে একদিন ডঃ সরকারের চেম্বারে চলে এসেছিল তমোঘ্ন। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার বলেছিলেন, “কোনো অর্গান ডোনার বা দাতার খোঁজ পেলে আপনাকে জানাব।”
অবশেষে এ সপ্তাহে সেই কাঙ্ক্ষিত ফোনটা এল। বহু প্রতীক্ষার পর আজ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চলেছে তমোঘ্ন, শেষ হতে চলেছে এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের রাত।
(দুই)
জ্ঞান ফিরতে তমোঘ্নর মনে প্রথমেই প্রশ্ন জাগল—সে এখন কোথায়?
কাঁচের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা ঝকঝকে একটা ঘর, নরম সাদা বিছানায় সে শুয়ে আছে। মাথার ওপর এসি চলছে নিঃশব্দে, শরীরটা বেশ ভারী লাগছে। ধীরে ধীরে গত চার ঘণ্টার স্মৃতি আবছাভাবে মনে পড়তে লাগল। ওটিতে চোখের ওপর জোরালো আলো, ফিসফিস কথাবার্তা, আর… পাশের বেডে শুয়ে থাকা একটা মানুষকেও কি সে আবছা দেখেছিল?
কোনোমতে সাহস সঞ্চয় করে কোমরটা একটু তুলে নিচের দিকে তাকাল তমোঘ্ন। বিস্ময় আর আনন্দে ওর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। হ্যাঁ, ডঃ সরকার পেরেছেন! ওর ব্যান্ডেজ বাঁধা হাঁটুর নিচে হুবহু রক্তমাংসের দুটো পা। যদিও পা দুটোতে এখনো বিশেষ কোনো অনুভূতি নেই, শুধু ঝিমুনি ধরার মতো একটা অবশ ভাব। তবে ওর বিশ্বাস, এতটা যখন হয়েছে, বাকিটুকুও সময়ের সঙ্গে ঠিক হয়ে যাবে।
“আপনার জ্ঞান ফিরেছে?” ডঃ সরকারের কন্ঠস্বরে চমকে উঠল তমোঘ্ন।
সে গদগদ হয়ে বলল, “হ্যাঁ স্যার। আপনি মানুষ নন, আপনি ভগবান! আপনার এই ঋণ আমি সারা জীবনেও শোধ করতে পারব না।”
ডঃ সরকার মৃদু হেসে বললেন, “প্রশংসা করে আমাকে লজ্জিত করবেন না। এটা আমার কর্তব্য। সব ওপরওয়ালার ইচ্ছে, আমরা তো কেবল মাধ্যম মাত্র।”
তমোঘ্ন জানতে চাইল, “আর কতদিন পর আমি হাঁটতে পারব স্যার?”
“আপাতত সাতদিন আপনাকে অবজারভেশনে থাকতে হবে। তারপর আমরা আপনাকে ছেড়ে দেব। পারবেন না সাতটা দিন অপেক্ষা করতে?”
তমোঘ্ন উত্তেজিত হয়ে বলল, “কেন পারব না? এতদিন যখন অপেক্ষা করতে পেরেছি, সাতদিন তো নস্যি!”
(তিন)
সাতদিনের আজই শেষ দিন। প্রথমদিকে পা দুটোকে নিয়ে মনটা একটু খুঁতখুঁত করছিল। মনে হচ্ছিল, পা দুটোর বয়স যেন ওর শরীরের বয়সের চেয়ে অনেকটা বেশি। চামড়াগুলো কেমন যেন কুঁচকানো। তবে এখন সেই অস্বস্তিটা সে মন থেকে ঝেড়ে ফেলেছে। নিজের জিনিসে খুঁত ধরতে নেই।
আজই বাড়ি ফিরেছে তমোঘ্ন। কিন্তু শরীরের মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করছে সে। আগে তেমন খিদে পেত না, বাঁচার প্রয়োজনে যতটুকু না খেলেই নয়, ততটুকুই খেত। আর এখন যেন পেটে রাক্ষুসে খিদে। সকাল থেকে গোগ্রাসে খেয়েও খিদে মিটছে না। ডাক্তারবাবু অবশ্য বলেছেন, মেজর অপারেশনের পর এমন ছোটখাটো সাইকোলজিক্যাল বা শারীরিক পরিবর্তন হতেই পারে।
পায়ে এখনো পুরো জোর ফিরে পায়নি, ক্র্যাচ ধরে হাঁটতে হচ্ছে। ইজিচেয়ারে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত লাগছিল। ক্র্যাচটা বগলে চেপে সে উঠে দাঁড়াল। বারান্দা দিয়ে হেঁটে ডাইনিংয়ের বিশাল আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
অ্যান্টিক আয়না, নিলাম থেকে বহু দামে কেনা। আয়নাটা কখনো ওর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, কিন্তু আজ করল। নিজের প্রতিবিম্ব দেখে চমকে উঠল সে। মুখের আদলে কি কোনো পরিবর্তন এসেছে? নাকি একজায়গায় বসে থাকার একঘেয়েমি?
মন ভালো করার জন্য সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাশের পার্কে গেল। পার্কে লোকজন বিশেষ নেই, শুধু বেঞ্চে বসে থাকা অরুণাভবাবুকে দেখে সে একটু অবাক হলো। পাশের কমপ্লেক্সেই থাকেন ভদ্রলোক। কিছুদিন আগে বাথরুমে পড়ে মাথায় চোট পেয়ে কোমায় চলে গিয়েছিলেন। বাঁচার আশা ছিল না প্রায়। উনি যে সুস্থ হয়ে ফিরেছেন, তমোঘ্ন জানত না।
সে গিয়ে অরুণাভবাবুর পাশে বসল। ভদ্রলোক তাকে দেখেও যেন চিনতে পারলেন না। অগত্যা তমোঘ্নই কথা শুরু করল, “কবে ফিরলেন?”
অরুণাভবাবু উদাসভাবে বললেন, “এই তো, দুদিন হলো।”
“মাথার চোট সারল?”
“হ্যাঁ, এখন পুরোপুরি ফিট।”
তমোঘ্ন হাসিমুখে বলল, “আমিও আজ সকালেই ফিরেছি। ডঃ বিনোদ সরকারের অপারেশনের পর আমি আবার নতুন পা ফিরে পেয়েছি।”
কথাটা শুনে অরুণাভবাবু সরু চোখে তাকালেন। ফিসফিস করে বললেন, “আপনিও বিনোদ সরকারের কাছে চিকিৎসা করিয়েছেন?”
তমোঘ্ন অবাক হয়ে বলল, “হ্যাঁ, কেন বলুন তো?”
চাপা গলায় অরুণাভবাবু বললেন, “আমিও ওনার কাছেই চিকিৎসা করিয়ে ফিরেছি। শুনুন, আপনি আমাকে যে লোক ভাবছেন, আমি আসলে সে নই। যেহেতু আপনিও বিনোদবাবুর রোগী, তাই আপনার কাছে লুকাব না। কিন্তু খবরদার, কথাটা গোপন রাখবেন।”
তমোঘ্নর কৌতূহল বাড়ল, “আপনি নির্ভয়ে বলতে পারেন।”
“আমি হলাম হরেন সরকার। বাসের কন্ডাক্টর ছিলাম। হঠাৎ একদিন স্ট্রোকে শরীরটা প্যারালাইজড হয়ে গেল। ব্রেন সচল ছিল, কিন্তু শরীরে নড়াচড়ার ক্ষমতা ছিল না। দীর্ঘ সাত বছর নরকযন্ত্রণা ভোগ করেছি। তারপর একদিন বিনোদবাবুর খোঁজ পেলাম। ভদ্রলোক বলেছিলেন, ‘ব্রেন ডেথ’ হওয়া কোনো রোগীর সন্ধান পেলে জানাবেন। ঠিক এই সময়েই অরুণাভবাবুর এক্সিডেন্ট হলো। ওনার ছেলেরা বাবাকে বাঁচাতে মরিয়া ছিল। ডঃ সরকার কি নিখুঁত হাতে এত অল্প সময়ে ব্রেন ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে দিলেন যে, চোখ খুলে দেখলাম আমি অন্য মানুষ হয়ে গেছি! দুঃখ একটাই, হরেন সরকার মানুষটার আর কোনো অস্তিত্ব রইল না। এখন আমাকে সারাজীবন অরুণাভ বোস হয়েই অভিনয় করে যেতে হবে।”
আফসোস ঝরে পড়ল তাঁর কণ্ঠে। তমোঘ্ন বলল, “অন্যের অস্তিত্ব ঘাড়ে করে বয়ে বেড়াতে আপনার কষ্ট হচ্ছে না?”
অরুণাভবাবু তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন, “পাগল! সাত বছর কী কষ্টে কাটিয়েছি জানেন? প্রতিনিয়ত বৌমাদের মুখঝামটা, ছেলেমেয়েগুলোর অবহেলা… আর এখন? স্ত্রী-পুত্র, নাতি-নাতনি নিয়ে ভরা সংসার, অগাধ টাকা। এসবই বিনোদবাবুর মতো ডাক্তারদের কৃতিত্ব। ওনারা মানুষ নন, দেবতা!”
তমোঘ্ন মাথা নাড়ল। তার মনের কথাটিই বলে দিয়েছেন অরুণাভবাবু। বেলা পড়ে আসছে দেখে সে ধীরে ধীরে বাড়ির পথ ধরল।
(চার)
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই চমকে উঠল তমোঘ্ন। সে এখন কোথায়?
এ তো পার্কের সেই বেঞ্চটা! কাল এখানেই বসে অরুণাভবাবুর সঙ্গে গল্প করছিল। কিন্তু সে এখানে এল কী করে? ওর স্পষ্ট মনে আছে, কাল রাতে নাইট গাউন পরে নিজের ঘরেই শুতে গিয়েছিল। মাঝরাতে একটা দুঃস্বপ্ন দেখছিল—আবছা অন্ধকারে একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে কেউ যেন তাকে ডাকছিল, “আয়… আয়…”
তবে কি সে সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ঘুমের ঘোরেই এখানে চলে এসেছে? ব্যাপারটা খুব রহস্যময়। ডঃ সরকার বলেছিলেন অপারেশনের পর একটু মানসিক পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু তাই বলে এমন?
পায়ে এখনো পুরোপুরি জোর নেই, এই অবস্থায় হুটহাট বেরিয়ে পড়লে বিপদ হতে পারে। তমোঘ্ন ঠিক করল, খুব শিগগিরই ডঃ সরকারের সঙ্গে একবার দেখা করবে।
(পাঁচ)
ইদানীং পা দুটো অনেকটাই বশে এসে গেছে। এখন বিকেলবেলায় নিয়মিত হাঁটতে বেরোয় সে। সেদিন রাতে ফিরে খুব ক্লান্ত লাগছিল। শুতে যাওয়ার আগে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। এ কী দেখছে সে!
এই কদিনে তার বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গেছে। মাথার চুলগুলো পেকে সাদা, মুখে বার্ধক্যের স্পষ্ট ছাপ। আয়নায় হাত রাখল তমোঘ্ন, মনে হলো প্রতিবিম্বটাও যেন করুণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সে কি তবে বুড়িয়ে যাচ্ছে? ঠিক তখনই বুকের ভেতর থেকে কে যেন ডেকে উঠল, “আয়… আয়…”। তারপর আর কিছু মনে নেই।
সকালে মুখে জলের ছিটে লাগতে ঘুম ভাঙল। চোখ মেলে দেখল, এক অপরিচিত ভদ্রলোকের বাড়ির দাওয়ায় সে শুয়ে আছে। ভদ্রলোক বিরক্তি নিয়ে বললেন, “অদ্ভুত ঘুম তো আপনার মশাই! এত ডাকাডাকি করছি, সাড়া নেই। শেষ পর্যন্ত জল দিতে হলো।”
বিস্ময়ে হতবাক তমোঘ্ন বলল, “আমি এখানে এলাম কী করে?”
ভদ্রলোক বললেন, “সেটা তো আপনিই ভালো জানবেন। সকালবেলা উঠে দেখি দুয়ার আগলে পড়ে আছেন। যতসব মাতালদের কারবার!”
লজ্জায় মাথা নিচু করে তমোঘ্ন সোজা ডঃ সরকারের চেম্বারে ছুটল। সব শুনে ডাক্তারবাবু গম্ভীর হলেন।
“এমন তো হওয়ার কথা নয়। এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে—আপনার ‘সোমনাবুলিজম’ বা ঘুমের মধ্যে হাঁটার রোগ আছে। এতদিন আপনার পা ছিল না, তাই রোগটা প্রকাশ পায়নি। এখন পা পেতেই সেটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।”
“এই রোগ থেকে কি আমার মুক্তি নেই ডাক্তারবাবু?”
“কেন থাকবে না? তবে আপাতত একটা সহজ টোটকা দিচ্ছি। আপনার শোবার ঘরের দরজায় একটা সেন্সর অ্যালার্ম লাগিয়ে নিন। দরজা খুললেই অ্যালার্ম বাজবে, আর আপনার ঘুম ভেঙে যাবে। এতে অন্তত ঘুমের ঘোরে বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।”
ডাক্তারবাবুর পরামর্শ মেনে সেদিনই দরজায় অ্যালার্ম লাগাল তমোঘ্ন। কিন্তু মানসিক শান্তি ফিরল না। প্রতিদিনই সে যেন আরও বেশি করে বুড়িয়ে যাচ্ছে। আর রাতে শুতে গেলেই সেই ডাকটা শুনতে পায়—”আয়… আয়…”
(ছয়)
মনটা হালকা করার জন্য সেদিন বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছিল। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে পথ ভুলে একটা সরু গলিতে ঢুকে পড়ল। জায়গাটা বেশ নোংরা, ঝুপড়ি ঘরবাড়ি। হঠাৎ একটা ঘরের ভেতর থেকে চাপা গলার ঝগড়া কানে এল।
একজন বলছে, “তুই কি ভাবছিস আমি কিছু জানি না? পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়েছিস, আর আমাকে এক লাখ দিয়ে ভুলিয়ে দিবি? সোজা পুলিশকে জানাব।”
অন্যজন অনুনয় করে বলছে, “ভাই, এমন করিস না। আমি তোকে আরও এক লাখ দিচ্ছি, কিন্তু এর বেশি এখন নেই…”
চুরি-ডাকাতির ভাগবাটোয়ারা নাকি? তমোঘ্নর বুকটা কেঁপে উঠল। জায়গাটা ভালো নয়, নিমাইপুরের বস্তি। এখান থেকে সরে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ। দ্রুত পায়ে গলি থেকে বেরিয়ে সে হাইওয়েতে এসে পড়ল। জায়গাটা চেনা চেনা লাগল। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ঠিক এই জায়গাতেই তার এক্সিডেন্ট হয়েছিল। কাকতালীয়ভাবে আজ সে এখানেই এসে পড়েছে।
(সাত)
রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছিল তমোঘ্ন। মনের ভেতর সেই ডাকটা আজ আরও তীব্র—”আয়… আয়… আমার কাছে আয়…”
এ কি নিশির ডাক? বহু কষ্টে একটু তন্দ্রা এসেছিল, হঠাৎ অ্যালার্মের শব্দে চমকে উঠল সে। ভয় আর বিস্ময়ে দেখল, সে দরজা খুলে বেরিয়ে যাচ্ছে! কিন্তু সে তো থামতে চাইছে, তবু পা দুটো যেন তার কথা শুনছে না! পা দুটোকে যেন অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে।
ঘর থেকে বেরিয়ে সে হাঁটতে শুরু করল। আকাশে মস্ত চাঁদ, ফুটফুটে জ্যোৎস্না। জনমানবহীন রাস্তায় শুধু তার পায়ের শব্দ। তমোঘ্নর হৃৎপিণ্ড গলার কাছে উঠে আসছে, তবু সে থামতে পারছে না।
শহর ছাড়িয়ে, ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে অবশেষে সে একটা নদীর চড়ায় এসে থামল। জায়গাটা একটা শ্মশান। চারদিকে পোড়া কাঠ আর ছাইয়ের স্তূপ। মাথার ওপর দিয়ে একটা রাতচরা পাখি কর্কশ শব্দে উড়ে গেল। এতক্ষণে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেল তমোঘ্ন।
নদীর জল ছলছল শব্দে বয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ হাড় হিম করা শিয়ালের ডাক শোনা গেল। তমোঘ্ন ভয়ে জ্ঞান হারাবে এমন সময় শ্মশানের এক কোণে বড় বটগাছটার নিচে কিছু একটা নজরে পড়ল। সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে কেউ একজন বসে খুকখুক করে কাশছে।
কাছে এগিয়ে যেতেই দেখল, এক জরাজীর্ণ বৃদ্ধ। পায়ের শব্দ পেয়ে বৃদ্ধ মুখ না তুলেই বলল, “কে রে? সুধীর এলি?”
তমোঘ্ন কাঁপা গলায় বলল, “আজ্ঞে না, আমি…”
বৃদ্ধ বলল, “মাফ করবেন বাবু। পায়ের শব্দটা বড্ড চেনা লাগল তো, তাই ভাবলাম সুধীর এসেছে।”
“সুধীর কে? আপনার ছেলে? আপনি এখানে একা বসে কেন?”
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “নার্সিংহোম থেকে ফেরার পথে ওই তো আমাকে এই গাছতলায় বসিয়ে দিয়ে গেল। বলল গাড়ি নিয়ে আসছি, কিন্তু এখনো ফিরল না। আমার বাড়ি ওই নিমাইপুরের বস্তিতে। দুই ছেলে আমার, সুধীর আর অধীর। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর থেকে খুব অভাবে দিন কাটছিল। আমি বড় ছেলের কাছেই থাকতাম।”
তমোঘ্ন জানতে চাইল, “নার্সিংহোমে গিয়েছিলেন কেন?”
“গিয়েছিলাম কি আর সাধে? টাকার লোভে। বড় ছেলে এসে বলল, আমার রক্ত নাকি খুব রেয়ার গ্রুপের। এক বড়লোক রোগীর রক্তের দরকার, মিলছে না কোথাও। ডাক্তার বলেছে, যে রক্ত দেবে তাকে পাঁচ লাখ টাকা দেবে। তাই গেলাম। আমার রক্তে রোগী বাঁচল ঠিকই, কিন্তু আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়লাম। নার্সিংহোম থেকে বেরোনোর পর ছেলে যখন দেখল বাবা আর আগের মতো খাটতে পারবে না, তখন এখানেই ফেলে দিয়ে গেল।”
তমোঘ্নর খুব মায়া হলো। সে বলল, “কী নিষ্ঠুর! টাকার লোভে নিজের বাবাকে এভাবে ফেলে গেল? কিন্তু দোষ তো সেই ডাক্তারেরও, যে টাকার টোপ দিয়েছিল। ডাক্তারটার নাম কী জানেন?”
বৃদ্ধ বলল, “নার্সিংহোমের নাম জানি না বাবু, তবে ডাক্তারের নামটা কানে এসেছিল—বিনোদ সরকার।”
বিনোদ সরকার! নামটা শুনেই আকাশ ভেঙে পড়ল তমোঘ্নর মাথায়। যাকে সে ভগবান ভেবেছে, সে আসলে শয়তান!
তমোঘ্ন নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “কিন্তু আপনি এখানে এভাবে পড়ে থাকবেন? চলুন আপনাকে কোথাও পৌঁছে দিই।”
বৃদ্ধ এবার অদ্ভুত এক হাসি হাসল, “কোথায় যাব বাবু? মরা মানুষকে কি কেউ আশ্রয় দেয়?”
তমোঘ্নর গলা শুকিয়ে গেল, “ম-মানে?”
বৃদ্ধর গলাটা হঠাৎ বদলে গেল, খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে বলল, “বিশ দিন আগে আমার রক্ত নিতে গিয়ে বিনোদ সরকার আমাকে মেরে ফেলেছে! মরার পর থেকে এটাই আমার আস্তানা। মরতে তো একদিন হতোই, তাতে দুঃখ নেই। দুঃখ একটাই—মরার পর থেকে আমি আমার পা দুটোকে আর খুঁজে পাচ্ছি না। ওদের কত ডাকছি, তবু ওরা আমার কাছে আসছে না… কোথায় যে গেল পা দুটো?”
বলতে বলতে গায়ের চাদরটা সরাল বৃদ্ধ।
তমোঘ্নর চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। চাদরের নিচে বৃদ্ধের শরীরের মাংস পচে খসে পড়েছে, পাঁজরের হাড় দেখা যাচ্ছে। আর… হাঁটুর নিচ থেকে পা দুটো নেই! সেখানে নিখুঁতভাবে অপারেশন করে ব্যান্ডেজ বাঁধা।
এক মুহূর্তে সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে গেল তমোঘ্নর কাছে। এই পা দুটো আসলে এই মৃত বৃদ্ধের! আর তাই বৃদ্ধের অতৃপ্ত আত্মা নিজের পা দুটোকে সমানে ডেকে চলেছে—”আয়… আয়…”
ভয় আর আতঙ্কে চিৎকার করে তমোঘ্ন উল্টো দিকে ছুটতে শুরু করল। বাতাসের বুকে তখনো ভেসে আসছে সেই হাড়হিম করা আর্তনাদ—
“ও বাবু, শুনে যান! আমার পা দুটো কোথায় একটু বলে দিয়ে যান না…”
(সমাপ্ত)


